দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মাহেন্দ্রক্ষণে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন। এই মেগা আসরের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত সম্মেলনে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে ঢাকা এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সম্প্রতি বিদেশ সফর শেষ করে ফেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনার পরেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই বিশেষ ‘ডিপ্লোম্যাটিক’ পত্রটি পাঠানো হয়। চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেছেন যে, ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের সম্মেলনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিমসটেক (BIMSTEC) চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এই ‘আউটরিচ’ পর্বের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, এই সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও মতবিনিময়ের আগ্রহও ব্যক্ত করেছেন মোদি। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছে।
বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া—এই ১১টি দেশ ব্রিকসের প্রভাবশালী সদস্য। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনে অংশ নেওয়া কেবল একটি বহুপাক্ষিক বৈঠকে উপস্থিত থাকা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্রিকস সদস্যপদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের একটি বড় সুযোগ। ইতিপূর্বে চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রতি তাদের জোরালো সমর্থনের কথা জানিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও দিল্লির বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন এই সফরকে এক জটিল সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে ইতিবাচক গতির প্রত্যাশা ছিল, সীমান্তে অব্যাহত পুশ-ইন এবং ভারতীয় নেতাদের বিরূপ মন্তব্যের কারণে তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা প্রকাশ ঢাকার জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও, সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীরের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি হবে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম মুখোমুখি হওয়ার এবং অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনার এক সুবর্ণ ‘প্যাকেজ’ সুযোগ।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়, বরং পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছে। ফলে জাতীয় স্বার্থ ও জনমতের কথা বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে এবং ‘বাজেট’ ঘাটতি মেটাতে বড় অর্থনীতির এই জোটের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবেই অপরিহার্য। এখন দেখার বিষয়, হোয়াইট হাউস এবং ক্রেমলিনের সঙ্গে ভারসাম্যের এই ‘প্রটোকল’ রক্ষা করে বাংলাদেশ দিল্লির এই আমন্ত্রণকে কীভাবে কাজে লাগায়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।