তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা, এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা এবং ভোটারদের কাছে জবাবদিহির বিষয়টি সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগোচ্ছে। নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বাচনের আগেই ভোটারদের আস্থা অর্জনে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সংগঠিত ও কার্যকর করার উদ্যোগের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা এবং এসব কর্মকাণ্ডের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব উঠে এলে একদিকে যেমন তৃণমূলের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরত্ব কমবে, অন্যদিকে এলাকার উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার প্রতিও জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরুর পর থেকেই তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে উৎসাহের পাশাপাশি এক ধরনের দায়বোধ তৈরি হয়েছে। অনেকেই নিজ উদ্যোগে ভোটারদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। রাস্তাঘাট মেরামত, স্কুল-কলেজের প্রয়োজনীয়তা এবং এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে করণীয় নিয়েও তারা কাজ করছেন।
তার মতে, এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভোটারদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ও বাড়ছে। জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য তারা এলাকায় বেশি সময় দিচ্ছেন। স্থানীয় বিরোধ ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও অনেকে উদ্যোগী হচ্ছেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় মানুষের জন্য তার ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি-সমর্থিত নির্দিষ্ট প্রার্থী থাকতে পারেন। একক কোনো প্রার্থীকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ থাকবে না।
স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সামনে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশনকে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোনো প্রার্থী কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, তা স্থানীয়ভাবে মানুষের কাছে পরিচিত হতে পারে। তবে এর কারণে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা কোনোভাবেই প্রভাবিত হবে না।
স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি অর্থবছরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের সর্বস্তরে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে সঙ্গে নিয়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। নির্বাচনে ভালো ফলাফলের জন্য যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রধান বিবেচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা উচিত। সরকারের উচিত নির্বাচনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। প্রশাসকদের দায়িত্ব শেষ না হলে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে পরে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি দায়িত্ব গ্রহণ করলে এলাকার মানুষের প্রতি তাদের দায়বোধ বাড়বে। ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সমস্যা, উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও তৈরি হবে।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি শুরু করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়েও নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে সরাসরি ও পরোক্ষ দুই ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলররা সরাসরি জনগণের গোপন ভোটে নির্বাচিত হন। নির্ধারিত এলাকার ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন।
অন্যদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইনে এসব নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত বিধি অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পন্ন করবে ইসি। ভোট গ্রহণের তারিখ, সময়, স্থান এবং নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়েও বিধান করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও একই ধরনের বিধান রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলের নেতৃত্ব, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক এবং নির্বাচনের পর জবাবদিহির বিষয়গুলো এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।