সরকারি সিকিউরিটিজ ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড এর প্রাথমিক বাজারে বিনিয়োগের জন্য প্রাইমারি ডিলার (পিডি) লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। তবে এই কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়ে আলাদাভাবে আবেদন করেছে বেসরকারি খাতের তিন ব্যাংক এবি ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক।
এর মধ্যে এবি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের পিডি লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের পিডি লাইসেন্স দুই বছরের জন্য স্থগিতের আবেদন এলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ তিন মাস স্থগিত রাখার বিষয়ে কাজ করছে।
অর্থ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে, এবি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের স্বেচ্ছায় পিডি লাইসেন্স সমর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাওয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে সম্মতি দিয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুই বছরের স্থগিতাদেশ চাওয়া হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে।
তিন ব্যাংকের আবেদনেই অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তারল্যসংকট। ফলে সরকারি সিকিউরিটিজের প্রাথমিক বাজারে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের চাপ সামলানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
পিডি ব্যাংক এখন ২৬টি
গত মে মাসে ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক নতুন করে পিডি লাইসেন্স পাওয়ার পর দেশে এ লাইসেন্সধারী ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬টি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক রয়েছে। বাকি ২২টি বেসরকারি ব্যাংক।
পিডি লাইসেন্স সাধারণত তিন বছরের জন্য দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হয়। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভবিষ্যতে পিডি লাইসেন্সধারী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ও পারফরম্যান্স প্রতিবছর মূল্যায়নের চিন্তা করছে সরকার। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন করে পিডি নিয়োগ, লাইসেন্স নবায়ন কিংবা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকা ঋণের পরও চাপ
এবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গত ১২ মে পিডি লাইসেন্স সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১ অক্টোবর থেকে লাইসেন্স বাতিল চেয়ে অর্থ বিভাগে আবেদন করেছে ব্যাংকটি।
আবেদনে এবি ব্যাংক জানায়, পিডি লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকেই তারা সরকারি সিকিউরিটিজের প্রাথমিক বাজারে বিনিয়োগ করে আসছে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকার ডিমান্ড ঋণ নেওয়ার পরও ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান বলেন, ব্যাংকের বর্তমান বাস্তবতায় পিডি লাইসেন্স রাখার প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করছেন। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ভবিষ্যতে আবার এ লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের পরিকল্পনা
বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকও ১ অক্টোবর থেকে পিডি লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করেছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, কার্যক্রম শুরুর পর গ্রাহক বৃদ্ধি ও আমানত কার্যক্রম শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হলেও বর্তমানে তারা সংকটের মধ্যে রয়েছে।
তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এম আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের জন্য তারা আবেদন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ইসলামি ব্যাংক বিল্ড-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে না। এ কারণেই পিডি লাইসেন্স প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে।
দুই বছরের স্থগিত চেয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক
ন্যাশনাল ব্যাংক দুই বছরের জন্য পিডি লাইসেন্স স্থগিতের আবেদন করেছে। অর্থ বিভাগকে দেওয়া আবেদনে ব্যাংকটি জানিয়েছে, তারা তারল্যসংকটে রয়েছে। ধারাবাহিকভাবে নগদ জমার অনুপাত (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যমান পিডি নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতা পূরণ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমানত ও ঋণ আদায় বাড়ানো এবং ব্যয় সংকোচনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে ব্যাংকটি।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান আহমেদ বলেন, তাঁরা দুই বছরের জন্য পিডি কার্যক্রম স্থগিত চেয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ব্যাংকের বিভিন্ন পরিকল্পনা জমা দেওয়া আছে। সেগুলো বিবেচনায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে। এ কারণেই তিন মাসের স্থগিতাদেশের পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ট্রেজারি বিল-বন্ডে কী হয়
ট্রেজারি বিল বা টি-বিল হলো স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণপত্র। এগুলো ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের মেয়াদে ইস্যু করা হয়। অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ড বা বিজিটিবি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণপত্র, যার মেয়াদ দুই বছর থেকে ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
সরকার নতুন বিল বা বন্ড ইস্যু করলে পিডি ব্যাংকগুলো নিলামে অংশ নিয়ে নির্ধারিত পরিমাণ সিকিউরিটিজ কেনে। একই সঙ্গে তারা সরকারি সিকিউরিটিজের প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, টি-বিল ও বিজিটিবি কেনায় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বড় ভূমিকা রয়েছে। অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকও নিয়মিত বড় অঙ্কে বিনিয়োগ করে। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সিটি ব্যাংক বন্ড বাজারে সক্রিয়। ইস্টার্ন ব্যাংক ট্রেজারি কার্যক্রমে পরিচিত। পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও এইচএসবিসির বৈদেশিক ও বন্ড বাজারে শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
প্রাইমারি ডিলারস বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিডিবিএল) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি সিকিউরিটিজের নিলামে অংশ নিতে তারল্য প্রয়োজন। যেসব ব্যাংক কিছুটা সমস্যায় রয়েছে, তাদের পিডি লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নেওয়া স্বাভাবিক। এটি সাধারণ প্রক্রিয়া এবং আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আবার এ কার্যক্রমে ফিরতে পারে।
ফলে তিন ব্যাংকের পিডি কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে শুধু সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের অনাগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি, নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা এবং বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ক্ষেত্রে ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের পরিকল্পনাও এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।