গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরই পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে দর-কষাকষি। এর প্রভাব পড়ছে বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনের খরচে।
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ছে
বেনাপোল থেকে ১৫ টন পণ্য ঢাকায় পরিবহনে আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম রুটে আগে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ রুটে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা থেকে ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা।
অর্থাৎ রুট ও গন্তব্যভেদে একটি ট্রিপেই বাড়তি ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কোনো কোনো রুটে এই অতিরিক্ত ব্যয় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বেনাপোল প্রতিনিধি কাজী শাহজাহান সবুজ জানান, ভাড়া বাড়ানো নিয়ে আমদানিকারক ও ট্রাকচালকদের মধ্যে দর-কষাকষির পাশাপাশি বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। প্রতিদিন বন্দর থেকে শত শত ট্রাক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করায় বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ট্রাক পরিচালনার বড় অংশের ব্যয় জ্বালানিতে। এর সঙ্গে টায়ার, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, টোল ও ফেরির খরচও রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ট্রাককে খালি ফিরতে হয়। ফলে জ্বালানির বাড়তি দাম এবং খালি ফেরার পরিচালন ব্যয় দুই দিক থেকেই পরিবহন খরচ বাড়ছে।
৮০ শতাংশ ব্যয় ডিজেলনির্ভর
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর খান বলেন, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় না হওয়ায় মালিকেরা চাপের মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণে কিলোমিটার ও পণ্যের ওজনের ভিত্তিতে একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সঙ্গে সেই কাঠামো অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয়ের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
কাঁচাবাজারে দ্বিতীয় ধাক্কা
ট্রাকভাড়া বাড়ার প্রভাব রাজধানীর কাঁচাবাজারেও দেখা যাচ্ছে। কাওরান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলাসহ কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য আনতে ট্রাক ও পিকআপের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত খরচ খেত থেকে আড়ত, আড়ত থেকে পাইকার এবং পাইকার থেকে খুচরা পর্যায়ে ভাগ হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।
আমদানি পণ্যে বাড়ছে লজিস্টিক ব্যয়
শুধু অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন নয়, আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত ২৩টি বেসরকারি আইসিডি ও অফডক পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কয়েকটি চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে বন্দর থেকে পণ্য বের হওয়ার আগেই ট্রাকভাড়ার পাশাপাশি হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য লজিস্টিক ব্যয়ও যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক। এর প্রভাব উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।
তিনি জানান, রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং আমদানি কনটেইনারের ২০ থেকে ২৩ শতাংশ বেসরকারি অফডকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ট্রাকভাড়ার বাড়তি চাপের সঙ্গে লজিস্টিক ব্যয়ের নতুন চাপও যুক্ত হয়েছে।
আবার বাড়ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ভাড়া
চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানির দাম বাড়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ট্রিপপ্রতি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। এবার ডিজেলের দাম নতুন করে ২০ টাকা বাড়ায় একই রুটসহ দেশের অন্যান্য পণ্য পরিবহন পথেও ভাড়া সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিবহন মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, গণপরিবহনের মতো পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট ভাড়া কাঠামো করা হোক। কিলোমিটার, পণ্যের ওজন ও গাড়ির ধরন বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হলে জ্বালানির দাম বাড়ার পর প্রতিবার নতুন করে দর-কষাকষির প্রবণতা কমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
ডিজেলের বাড়তি দাম তাই শুধু ট্রাক পরিচালনার হিসাবই বদলাচ্ছে না, পণ্য বাজারে পৌঁছানোর খরচও বাড়াচ্ছে। বন্দর থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হলে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।