জার্মানিতে নজিরবিহীন গোপন বৈঠক: ইরান ইস্যুতে এক টেবিলে ইসরায়েল ও আরবের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা!

ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এক টেবিলে বসে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। গত সপ্তাহে জার্মানির মাটিতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে।

পুরো বৈঠকের নেপথ্য উদ্যোক্তা ছিলেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। অংশ নেওয়া রাষ্ট্রগুলোর কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে এ নিয়ে মুখ খোলেনি। অতীতে এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক সংলাপের নজির থাকলেও, ছয় মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর দুই পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম সরাসরি বৈঠক। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে যেসব উপসাগরীয় আরব দেশের এখনো কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি, সেই সমস্ত দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের জন্য ইসরায়েলি সামরিক নেতৃত্বের মুখোমুখি বসার এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি কৌশলগত মতবিনিময়ের এক বিরল সুযোগ তৈরি করে এই প্ল্যাটফর্ম।

উচ্চপর্যায়ের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের পাশাপাশি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও মিশরের সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফরা। বৈঠকে আঞ্চলিক অংশীদারদের আস্থা অর্জনে কড়া বার্তা দেন সেন্টকম প্রধান। তিনি স্পষ্ট আশ্বস্ত করেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের দফায় দফায় হামলা সত্ত্বেও এ অঞ্চল থেকে কোনোভাবেই মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পেন্টাগনের গৃহীত ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অবহিত করেন ব্র্যাড কুপার।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ জেনারেল ইয়াল যামির চলমান বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের সর্বশেষ অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। পরবর্তীতে সেন্টকম একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, জার্মানিতে একটি পূর্বনির্ধারিত সম্মেলনের আওতায় আটটি মিত্র দেশের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ‘নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার নানা সুযোগ’ সংক্রান্ত যৌথ রোডম্যাপ নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যে ঐতিহাসিক আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই তেল আবিবের সঙ্গে আরব দুনিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা সমঝোতার পরিধি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউরোপীয় কমান্ডের অধীনতা থেকে সরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্টকমের আওতাভুক্ত করা হয়। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সুবাদেই সেন্টকমের সমন্বয়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাবিষয়ক একীভূত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সক্রিয় অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায় ইসরায়েল।

চলমান যুদ্ধাবস্থায় আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—উভয় ধরনের সামরিক অপারেশনেই সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিখুঁত সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করে চলেছে তেল আবিব। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আরও নিশ্চিত করেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিজস্ব সেনাসদস্যসহ আধুনিক ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। এর পাশাপাশি রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক নজরদারি ও পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত (আইএসআর) সহায়তাও অবাধে দেওয়া হচ্ছে। চলমান সংঘাতের মধ্যে অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও ইসরায়েলের তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে।

কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গোপন বৈঠকটি এমন এক সংকটময় মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে সামরিক হামলা জোরদার করেছে। তারা স্থলভাগে আগ্রাসীভাবে অগ্রসর হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন—লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নিয়ে নিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপে ইসরায়েল কীভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা দিতে পারে, তা নিয়ে সেন্টকমের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের শীর্ষ পর্যায়ে নিবিড় আলাপ-আলোচনা চলছে। এর অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যেভাবে উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ও আইএসআর সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, ঠিক একই আদলে সৌদি সামরিক বাহিনীকেও নজরদারি ও গোয়েন্দা সহায়তার আওতায় নিয়ে আসার জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।