জাতিসংঘ সফরে ১১ দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরে ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

শুক্রবার নিউইয়র্কের জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব তথ্য জানান। মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের কর্মসূচির মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি অনুষ্ঠান, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল। এর বাইরে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

মাহদী আমিন জানান, সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয় আলোচনায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল কার্যক্রমও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচির পাঁচটিতে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। এর মধ্যে সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণ ছাড়াও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও ছিল সফরের অন্যতম অংশ।

সফরকালে রোহিঙ্গা সংকট এবং ধাত্রী বা মিডওয়াইফারি ও মাতৃ-নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করে। এ ছাড়া জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন এবং বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মালদ্বীপ, ভুটান, হাইতি, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে মাহদী আমিন জানান। এসব বৈঠকে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে।

বিশেষ করে সফরের শেষ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, আরও জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পায়। তিন দেশই প্রধানমন্ত্রীকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে মাহদী আমিন জানান।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে এসব আলোচনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন, মানবাধিকার, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পায়।

সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী জেপিমরগ্যান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ওয়াল স্ট্রিট’-এ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশে বিশেষ করে আর্থিক খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয় বলে মাহদী আমিন জানান। পরে তিনি ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। মাহদী আমিন জানান, তিনি আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে চারটিতে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্ম, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মিডওয়াইফারি ও মাতৃ-নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক অনুষ্ঠান ছিল।

মাহদী আমিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা চার দিনের সফরে সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টি বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর ভাষ্য, তুলনামূলক ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সফরের সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং প্রতিটি বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ ভাষণ প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ভাষণে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর মতে, এই সফরের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।