রংপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিভাগীয় ইফতার ও দোয়া মাহফিলকে কেন্দ্র করে দলটির দুই সহযোগী সংগঠনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় ছাত্রশক্তির মহানগর কমিটির কতিপয় নেতার বিরুদ্ধে জাতীয় যুবশক্তির রংপুর মহানগর ও জেলা কমিটির নেতাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যুবশক্তির নেতাদের দাবি, এই হামলায় তাদের অন্তত পাঁচজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। আহতদের মধ্যে দুজন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং বাকি তিনজন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় রংপুর মহানগরীর শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়ামে এই বিভাগীয় ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীর উদ্দীন পাটওয়ারী এবং রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বহিঃপ্রকাশে দলের অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
এনসিপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় ইফতারের পূর্বে স্টেডিয়ামের প্রবেশমুখে। সেখানে অভ্যর্থনার দায়িত্বে ছিল রংপুর মহানগর ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা।
এনসিপির রংপুর মহানগর কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আলমগীর নয়নের অভিযোগ অনুযায়ী, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা থেকে যুবশক্তির পাঁচজন কর্মী ইফতারে যোগ দিতে এসেছিলেন, কিন্তু তাদের কাছে দাওয়াত কার্ড ছিল না। প্রবেশমুখে ছাত্রশক্তির নেতারা তাদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দিলে, তিনি নিজে তাদের নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তখনই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ছাত্রশক্তির নেতারা সেখানে হট্টগোল শুরু করে।
আলমগীর নয়ন অভিযোগ করে বলেন, "ছাত্রশক্তির মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব ফারহান তানভীর (ফাহিম) এবং যুগ্ম আহ্বায়ক রাজিমুজ্জামান হৃদয়সহ কয়েকজন আমাকে দুই দফায় ধাক্কা দেয়। আমাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে যুবশক্তির জেলা কমিটির সংগঠক রাশেদুজ্জামান ও বদরগঞ্জ উপজেলা কমিটির সংগঠক আকাশ ইসলামকে তারা মারধর করে।" তার দাবি, রংপুর মহানগর ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহম্মদের নির্দেশেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে মহানগর ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, "নিজেদের মধ্যে একটু বিশৃঙ্খলা হয়েছিল। টুকিটাকি ঝামেলা হয়েছে, সেটা মিউচুয়াল (মীমাংসা) হয়ে গেছে।"
তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। জেলা ও মহানগর যুবশক্তির নেতাদের অভিযোগ, গেটের ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় ইফতারের পর স্টেডিয়ামের ভেতরে যুবশক্তির মহানগরের সংগঠক মোতাওয়াক্কিল বিল্লাহ শাহ ফকিরের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। ফারহান তানভীর, রাজিমুজ্জামান হৃদয়, যুগ্ম সদস্যসচিব মেহেদী হাসান, সংগঠক নাঈম এবং জেলা কমিটির বহিষ্কৃত সদস্য তাহমীদসহ একদল যুবক তাকে বেধড়ক মারধর করে।
রংপুরের একটি বেসরকারি কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোতাওয়াক্কিল বিল্লাহ বলেন, "আমাকে টেবিলের ভাঙা কাঠ দিয়ে এমনভাবে মারধর করা হচ্ছিল যে, এক পর্যায়ে আমি আত্মরক্ষার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে স্টেডিয়ামের মাঠে গিয়ে পড়ে যাই।" তিনি জানান, তাকে বাঁচাতে গিয়ে জেলা যুবশক্তির সংগঠক লেমন শাহ এবং জেলা ছাত্রশক্তির সংগঠক সীমান্ত হোসেনসহ আরও চার-পাঁচজন হামলার শিকার হন। মোতাওয়াক্কিল বিল্লাহর সঙ্গে লেমন শাহ ও রাশেদুজ্জামানও একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রশক্তির নেতা ফারহান তানভীর বলেন, “এটা আমাদের রাজনৈতিক প্রোগ্রাম ছিল। এটা নিয়ে আমাদের হাউসে মিটিং হচ্ছে। এটা নিয়ে স্টেটমেন্ট (বক্তব্য) দেওয়ার কিছু নেই। মারামারি দুই পক্ষেরই হয়েছে।” অন্যদিকে, আরেক অভিযুক্ত রাজিমুজ্জামান দাবি করেন, “হামলা বা কারও গায়ে আঘাত করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। এটা অভ্যন্তরীণ বিষয়। নিজেদের মধ্যে কথা বলে মীমাংসা করা হবে।”
এ বিষয়ে এনসিপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ বলেন, “বিষয়টা নিয়ে আমরা বসেছি। যারা অন্যায় করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।