বলিউডের ঝলমলে আলোকছটা আর গ্ল্যামারের হাতছানি অনেক সময় জীবনের অন্ধকার চোরাবালিতে টেনে নিয়ে যায়, যার এক জীবন্ত উদাহরণ অভিনেত্রী মনিকা বেদি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দি, তামিল, তেলেগু এমনকি বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায়ও যাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করত, সেই সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার আজ আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক নিষিদ্ধ গল্পের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। ভারতের কুখ্যাত ডন আবু সালেমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কই মূলত মনিকা বেদির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, যা তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই মূলধারার সিনেমা জগত থেকে ‘ডিজিটাল’ নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুরে জন্ম নেওয়া মনিকার শৈশব কেটেছে নরওয়েতে। অভিনয়ের অদম্য নেশা নিয়ে ভারতে ফিরে এসে তিনি ‘সুরক্ষা’, ‘জোড়ি নম্বর ওয়ান’ এবং ‘পেয়ার ইশক অর মহাব্বত’-এর মতো বড় ‘বাজেট’ ও জনপ্রিয় সিনেমায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী আবু সালেমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সালেম তখন দুবাই থেকে বলিউডের অর্থায়ন আর ‘ক্রিমিনাল’ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতেন। মনিকার দাবি ছিল, তিনি সালেমকে স্রেফ একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে জানতেন, কিন্তু ততদিনে তাঁর নামের সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ডের তকমা লেপটে গেছে।
এই সম্পর্কের মাশুল দিতে গিয়ে মনিকাকে কেবল পেশাগত বয়কট নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনি মারপ্যাঁচেও পড়তে হয়। ২০০২ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে অবস্থানের দায়ে আবু সালেমের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন মনিকা। দীর্ঘ কয়েক বছরের আইনি লড়াই আর ‘এক্সট্রাডিশন’ বা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার পর তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। যদিও আদালতের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার প্রমাণ মেলেনি, তবুও জাল পাসপোর্ট মামলায় তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হয়। সেই ‘ডেডলাইন’ বা জেলের দিনগুলো তাঁর ক্যারিয়ারের সোনালী সময়কে চিরতরে গ্রাস করে নেয়।
মুক্তির পর মনিকা বেদি নিজেকে নতুন করে প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। ২০০৮ সালে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস’-এ অংশগ্রহণ করে তিনি জনমত নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন এবং পরবর্তীতে কিছু টেলিভিশন সিরিয়াল ও আঞ্চলিক ‘প্রজেক্ট’-এ কাজ করেন। তবে বলিউডের প্রথম সারির নির্মাতারা তাঁকে নিয়ে আর ঝুঁকি নিতে চাননি। অতীতের সেই অন্ধকার ছায়া তাঁর বর্তমানকে বারবার তাড়া করে ফিরেছে।
বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন আবেগঘন সাক্ষাৎকারে মনিকা বেদি আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, "আমি ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু সেই সম্পর্ক আমার ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক শান্তি—সবই কেড়ে নিয়েছে।" আজ যখন ‘স্মার্টফোন’ আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পুরোনো সব কাহিনী পুনরায় সামনে আসে, তখন মনিকা বেদি কেবল একজন হারিয়ে যাওয়া নায়িকা নন, বরং বলিউডের ইতিহাসে গ্ল্যামার আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক বিপজ্জনক মেলবন্ধনের করুণ স্মারক হিসেবেই রয়ে যান।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।