গাজায় চিরস্থায়ী শান্তির সংকেত? ট্রাম্পের ১৫ দফার সেই রহস্যময় রোডম্যাপে যা আছে

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং গাজা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় রুখতে এক অভাবনীয় ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার চূড়ান্ত পর্যায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৫ দফার একটি বিস্তারিত রূপরেখা বা ‘রোডম্যাপ’ প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’। এই বিশেষ পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের মতো স্পর্শকাতর ও কঠিন শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, তারা প্রস্তাবিত এই চুক্তির শর্তাবলীতে নীতিগতভাবে সম্মত। তবে আন্তর্জাতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল হলো ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে। তেল আবিব এখন পর্যন্ত এই ১৫ দফার রূপরেখা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা ‘স্টেটমেন্ট’ প্রদান করেনি।

রোডম্যাপের মূল পয়েন্টগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

যুদ্ধবিরতি ও ক্ষমতা হস্তান্তর: পরিকল্পনার প্রথম ধাপেই ইসরায়েল, হামাসসহ সংশ্লিষ্ট সকল সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে সকল পক্ষ চূড়ান্তভাবে সই করার ১৪ দিনের মধ্যেই এই ‘প্যাকেজ’ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। এরপরই গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করবে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি), যারা অঞ্চলটির প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বুঝে নেবে।

তদারকি ও প্রশাসনিক নীতি: এই রোডম্যাপের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য গঠিত হবে ‘ইন্টারন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি’ (আইভিসি)। এক ধাপ থেকে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে আইভিসি নিশ্চিত করবে যে পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিগুলো কোনো পক্ষই লঙ্ঘন করেনি। গাজার শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে ‘এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন, এক অস্ত্র’—এই মৌলিক নীতির ভিত্তিতে। এনসিএজি ফিলিস্তিনি আইন ও আন্তর্জাতিক ‘স্ট্যান্ডার্ড’ অনুযায়ী গাজাবাসীর সেবা নিশ্চিত করবে।

পুলিশ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: বিদ্যমান পুলিশ কাঠামোর আমূল সংস্কারের কথা বলা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের পুলিশে যুক্ত করার আগে তাঁদের অতীত রেকর্ড কঠোরভাবে ‘ভেটিং’ বা যাচাই করা হবে। যারা পেশাদার যোগ্যতায় অকৃতকার্য হবেন, তাঁদের বিকল্প বেসামরিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হবে। গাজার সমস্ত মারণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে একমাত্র এনসিএজি-র হাতে।

সুড়ঙ্গ ধ্বংস ও সেনা প্রত্যাহার: হামাসের কাছে থাকা সকল ভারী অস্ত্র, সমরাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং তাদের কৌশলগত নেটওয়ার্ক বা সুড়ঙ্গগুলো পুরোপুরি অকার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর বিনিময়ে ইসরায়েলি বাহিনী পর্যায়ক্রমে গাজার প্রতিটি অংশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবে। কোনো অবস্থাতেই গাজার বাইরের কোনো পক্ষের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করা যাবে না বলে কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক বাহিনী: অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বন্ধে একটি ‘সামাজিক শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হবে। একই সঙ্গে গাজায় অস্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হবে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ)। এই বহুজাতিক বাহিনী মূলত ইসরায়েলি সেনা ও এনসিএজি-র মধ্যকার ব্যবধান বজায় রাখা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশকে পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ করবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রোডম্যাপটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক নতুন মোড় নিতে পারে। যদিও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ১৫ দফা বাস্তবায়ন করা হোয়াইট হাউসের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, তবুও হামাসের সম্মতি এই শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন গতির সঞ্চার করেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।