খানজাহান আলীর মাজারের সেই কুমির এখন কোথায়? দুই মাস না খেয়ে থাকার নেপথ্যে কী?

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)–এর মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে আনা সেই আলোচিত মাদি কুমিরটির স্থায়ী আবাসস্থল নিয়ে এখনো কাটেনি চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা। দিঘির পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর প্রাণীটিকে বর্তমানে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে রাখা হলেও, একে কোথায় পাঠানো হবে—সাফারি পার্ক না কি অন্য কোনো বৃহৎ অভয়ারণ্য—সে বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে বন বিভাগ। খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল গতকাল মঙ্গলবার দেশ মিডিয়াকে জানান, বিষয়টি বর্তমানে বন অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বা ‘ক্যাবিনেট’ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, দিঘি থেকে সরিয়ে আনার পর গত প্রায় দুই মাস ধরে কুমিরটি কোনো ধরণের খাবার স্পর্শ করেনি। সাধারণত দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকলে যেকোনো প্রাণীর জীবন সংকটে পড়ার কথা থাকলেও, কুমিরের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এ বিষয়ে বন বিভাগ অস্ট্রেলিয়ার কুমির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পরিবেশে বা ‘ক্যাপটিভ’ অবস্থায় কুমিরেরা মানসিক চাপে থাকে এবং অনেক সময় এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত খাবার না খেয়েও বেঁচে থাকতে পারে। তাই কৃত্রিমভাবে বা জোর করে খাবার খাওয়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে কুমিরটির ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চিত, ঠিক তখনই মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দুটি নতুন কুমির চেয়ে করা একটি আবেদন বন বিভাগের হাতে এসে পৌঁছেছে। যদিও আবেদনটি গত বছরের আগস্টে জেলা প্রশাসনের কাছে করা হয়েছিল, কিন্তু আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা বা ‘প্রটোকল’ মেনে সেটি গত সপ্তাহে বন বিভাগের খুলনা কার্যালয়ে পৌঁছায়। মাজার কর্তৃপক্ষ চায় দিঘির ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বজায় রাখতে সেখানে পুনরায় কুমির রাখা হোক। তবে বন বিভাগ জানিয়েছে, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এ ধরণের প্রাণীকে ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পালনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং এর চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে ঢাকার বন সংরক্ষক অফিসের হাতে।

উল্লেখ্য, গত ১ জুন খানজাহান আলীর মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামা সাত বছর বয়সী এক শিশুকে কুমিরটি টেনে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে শিশুটির মৃত্যু ঘটে। জননিরাপত্তার স্বার্থে এবং স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক নিরসনে ৩ জুন বন বিভাগ একটি বিশেষ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় ৪৫ বছর বয়সী এবং আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি ওজনের এই বিশালকার মাদি কুমিরটিকে দিঘি থেকে সরিয়ে খুলনায় স্থানান্তর করা হয়।

বাংলাদেশে মিঠাপানির কুমির এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকায়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০০০ সালেই এই প্রাণীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয় থেকে কিছু মিঠাপানির কুমির উদ্ধারের ঘটনা পরিবেশবিদদের মনে নতুন আশা জাগিয়েছে। বর্তমানে এই কুমিরটির পুনর্বাসন নিয়ে যে ‘বাজেট’ ও পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে, তা দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে। আপাতত এক বড় ধরণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে মাজারের এই স্মৃতিবিজড়িত কুমিরের শেষ গন্তব্য।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।