বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) কেবল একটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মৌলিক ক্ষেত্রে এআই নিয়ে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এই উদীয়মান প্রযুক্তির বাজারে দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে সেখানে ভাগ বসাতে শুরু করেছে চীন। বেইজিংয়ের এই পদচারণা এখন আর কেবল দৃশ্যমানই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ‘অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে উঠছে। তবে বিশ্বজুড়ে এখন বড় প্রশ্ন-প্রযুক্তির এই দীর্ঘ দৌড়ে শেষ পর্যন্ত কি ওয়াশিংটনকে টপকে যেতে পারবে বেইজিং?
সম্প্রতি ‘ওপেনরাউটার’-এর এক গবেষণায় এই দ্বৈরথ নিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে বিশ্ববাজারে চীনের তৈরি ‘ওপেন সোর্স’ এআই মডেলের ব্যবহার ছিল মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশে। চীনের এই বিশাল উত্থানের পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছে আলিবাবার মতো টেক জায়ান্টরা। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ৪০০-এর বেশি ‘কিউয়েন’ (Qwen) মডেল উন্মুক্ত করেছে, যা চলতি মাসের শুরু পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির বেশি বার ডাউনলোড হওয়ার রেকর্ড গড়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই ‘ওপেন সোর্স’ কৌশল মূলত একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। ওমদিয়া (Omdia)-র প্রধান বিশ্লেষক লিয়ান জে সু-র মতে, এই কৌশলের মাধ্যমে চীন সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে চায়। যদি কোনো কোম্পানি সরাসরি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে, তবুও তাদের উন্মুক্ত মডেলগুলো বিশ্বজুড়ে সচল থাকবে। অন্যদিকে, লিওনিস ক্যাপিটালের পার্টনার জেনি শাও মনে করেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যারের জন্য অর্থ খরচ করতে ঐতিহাসিকভাবেই বিমুখ। ফলে সেখানে ওপেন সোর্স মডেল ছাড়া জনপ্রিয় হওয়ার বিকল্প কোনো পথ নেই।
চীনের এই জয়জয়কারের মধ্যেও মার্কিন টেক জায়ান্টরা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই। পারফরম্যান্স বা সক্ষমতার বিচারে ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি’, গুগলের ‘জেমিনি’ কিংবা অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড’-এর মতো ক্লোজড মডেলগুলো এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সারা বিশ্বে মোট ডাউনলোডের প্রায় ৭০ শতাংশই এখনো এই মার্কিন ক্লোজড মডেলগুলোর দখলে রয়েছে।
তবে চীনের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের অভাব। ওয়াশিংটনের কঠোর রফতানি নিয়ন্ত্রণের কারণে এনভিডিয়ার (Nvidia) সর্বাধুনিক ‘ব্ল্যাকওয়েল’ বা ‘রুবিন’ সিরিজের চিপগুলো চীন সংগ্রহ করতে পারছে না। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এনভিডিয়ার পুরনো ‘এইচ২০০’ (H200) চিপ রফতানির অনুমতি দিয়েছে, তবে বেইজিং জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে এখনো এই চিপ আমদানির আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করেনি।
পাশাপাশি পুঁজির সংকটেও ভুগছে চীনা স্টার্টআপগুলো। মার্কিন কোম্পানিগুলো যেখানে দফায় দফায় বিপুল পরিমাণ ‘ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড’ পায়, সেখানে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারীর অভাবে দ্রুত পাবলিক লিস্টিং বা শেয়ার বাজারে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ‘জেডডটএআই’ (Zhipu AI) এবং ‘মিনিম্যাক্স’-এর মতো সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল নগদ অর্থ জোগাড় করতেই সময়ের আগে বাজারে নামতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে উদ্ভাবনে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও প্রযুক্তির প্রায়োগিক দিক থেকে চীন বেশ এগিয়ে। আইডিসির (IDC) এআই গবেষণা প্রধান দীপিকা গিরি জানান, চীন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সাধারণ ব্যবহারকারীদের উপযোগী অ্যাপ্লিকেশন এবং শিল্পক্ষেত্রে এআই যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। গত মাসে বেইজিং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এআই ব্যবহারের একটি বিশেষ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা উন্মোচন করেছে, যা তাদের শিল্প বিপ্লবকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওপেনএআই-এর সাবেক গবেষক এবং বর্তমানে টেনসেন্টের প্রধান এআই বিজ্ঞানী ইয়াও শুনইউ-র মতে, পশ্চিমের প্রযুক্তি দ্রুত অনুকরণ বা সেটিকে আরও উন্নত করার অসাধারণ ক্ষমতা চীনের রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, আসল লড়াইটা প্রযুক্তির চেয়েও বেশি সংস্কৃতির। তার ভাষায়, চীনে মেধাবী মানুষের অভাব নেই, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন কোনো বৈপ্লবিক ধারা তৈরি করার মতো ‘ঝুঁকি গ্রহণকারী’ বা অকুতোভয় উদ্ভাবকের সংকট রয়েছে।
যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের এআই শিল্প কেবল ‘অনুকরণকারী’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, তবে তারা অদূর ভবিষ্যতে ‘উদ্ভাবকের’ আসনে বসতে পারবে কিনা, সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, প্রযুক্তির এই বিশ্বযুদ্ধে বেইজিং সহজে হাল ছাড়ছে না।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।