ইসরায়েলকে ৪০ হাজার শক্তিশালী বোমা বিক্রিতে বাগড়া: ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ‘ভেটো’!

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া একটি বিশাল অস্ত্র চুক্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আইনপ্রণেতারা। দেশটির কাছে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন (২৮০ কোটি) মার্কিন ডলার মূল্যের প্রাণঘাতী সামরিক অস্ত্র ও ভারী বোমাবহর বিক্রির অর্থায়নে সরাসরি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত করে দিয়েছেন মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শ্যাহিন। একই অবস্থানে সংহতি প্রকাশ করে এই মারণাস্ত্রের চালান ছাড়পত্রে বাধা দিয়েছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকসও। শীর্ষ দুই আইনপ্রণেতার এই অনড় অবস্থানের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাটদের গভীর অসন্তোষ ও প্রকাশ্য অনাস্থা আবারও তীব্রভাবে সামনে এলো।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিল’ এবং ‘সেমাফোর’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত এই বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রতিটি এক টন (২ হাজার পাউন্ড) ওজনের প্রায় ৪০ হাজার অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক বোমা ইসরায়েলের হাতে তুলে দেওয়ার সামরিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন। উল্লেখ্য, গাজা উপত্যকায় নির্বিচার বোমাবর্ষণে নজিরবিহীন বেসামরিক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় সাবেক বাইডেন প্রশাসন এসব ভারী বোমার চালান পাঠানো স্থগিত করে রেখেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন সেই স্থগিতাদেশ কাটিয়ে পুনরায় চালানটি সচল করার উদ্যোগ নিলে এবার ক্যাপিটল হিল থেকেই তীব্র বাধার মুখে পড়ল তা।

প্রভাবশালী সিনেটর জিন শ্যাহিন কঠোর অভিযোগ তুলে জানান, অবরুদ্ধ গাজায় প্রতিনিয়ত নির্বিচার বেসামরিক সাধারণ মানুষ হত্যা বন্ধে এবং মার্কিন আইনপ্রণেতাদের তোলা গুরুতর উদ্বেগগুলো নিরসনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেননি। এছাড়া ফিলিস্তিনের পাশাপাশি সিরিয়ার অভ্যন্তরে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী ও আগ্রাসী বোমাবর্ষণ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অব্যাহত হামলায় নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর বাড়তে থাকা চরম সহিংসতা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ উগরে দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ও সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটি এবং প্রতিনিধি পরিষদের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ সদস্যদের যেকোনো বড় সামরিক সহায়তা বা বাণিজ্যিক অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্তে অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ অথবা কার্যকর ভেটো দেওয়ার একক আইনি এখতিয়ার রয়েছে। ফলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে সাধারণত যেকোনো বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র বিক্রির চুক্তি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট কমিটির শীর্ষ আইনপ্রণেতাদের সব ধরনের উদ্বেগ নিরসন করে তাদের বাধ্যতামূলক সম্মতি আদায় করতে হয়।

প্রতিনিধি পরিষদের অন্যতম শীর্ষ প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতা গ্রেগরি মিকস সম্প্রতি এক অত্যন্ত বিরল প্রকাশ্য বিবৃতিতে সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করে জানান, নেতানিয়াহু সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এসব মারাত্মক প্রাণঘাতী অস্ত্র আদৌ আন্তর্জাতিক মানবিক যুদ্ধ আইন ও মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি বিধি যথাযথভাবে মেনে পরিচালনা করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ও অস্পষ্টতা রয়েছে।

পুরো সংকট ও উদ্বেগের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘সিএনএন’-কে এক সাক্ষাৎকারে সিনেটর জিন শ্যাহিন বলেন, "ইসরায়েল যা করছে, তা নিয়ে আমরা সবাই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গাজায় তারা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং সিরিয়ায় যেভাবে বোমাবর্ষণ করছে—তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য মারাত্মক হুমকি।"

নেতানিয়াহুর কট্টর যুদ্ধংদেহী নীতির তীব্র সমালোচনা করে তেল আবিবকে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানান এই ডেমোক্র্যাট নেত্রী। শ্যাহিন আরও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, "নেতানিয়াহুকে আমেরিকার কাছ থেকে পরিষ্কার শুনতে হবে যে, তিনি যা করছেন তা আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। পশ্চিম তীরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ফিলিস্তিনিরা নিহত হচ্ছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। অথচ নেতানিয়াহু সরকার এ বর্বরতা থামাতে কিছুই করেনি।"

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর একটানা সামরিক আগ্রাসন ও বর্বরোচিত হামলায় নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে, যার এক বিশাল অংশই চরম অসহায় নারী ও নিষ্পাপ শিশু। এমন চরম এক রক্তাক্ত ও বৈশ্বিক নিন্দার পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে আবারও মার্কিন কোষাগারের সহায়তায় এক টনি দানবীয় মারণাস্ত্র সরবরাহের সরকারি উদ্যোগ স্বয়ং ওয়াশিংটনের রাজনীতির অন্দরেই প্রবল অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও নৈতিক বাধার মুখে পড়ল।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।