আমেরিকার হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে বেইজিংমুখী কানাডা? জরিপে চাঞ্চল্যকর তথ্য

 বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন খোদ আমেরিকার প্রতিবেশী রাষ্ট্র কানাডার ব্যবসায়িক মহলে দেখা দিচ্ছে ভিন্ন সুর। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রচ্ছন্ন হুমকি ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন উপেক্ষা করেই আগামী দুই বছরে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার জোরালো প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন কানাডার শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক যৌথ জরিপের ফলাফলে উত্তর আমেরিকার এই দেশটির ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে।

কানাডা-চীন চেম্বার অফ কমার্স কর্তৃক পরিচালিত এই জরিপটি কানাডীয় ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের বর্তমান মানসিকতা ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৬৮ শতাংশ বা প্রতি ১০ জনের মধ্যে অন্তত ৭ জন ব্যবসায়ী মনে করেন, আগামী দুই বছরে চীনের সাথে তাদের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, গত বছর এই ইতিবাচক প্রত্যাশার হার ছিল ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বেইজিংয়ের প্রতি কানাডীয়দের বাণিজ্যিক আগ্রহ ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সিনহুয়ার বরাতে জানা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা বর্তমানে চীনকে তাদের সুনির্দিষ্ট খাত বা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ‘কৌশলগত বাজার’ (Strategic Market) হিসেবে গণ্য করছেন। গত বছর এই হার ছিল মাত্র ৩১ শতাংশ। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি এসেছে বিশ্বস্ততার প্রশ্নে। জরিপে দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা এখন চীনকে কানাডার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অধিক নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার বলে মনে করছেন। এর বিপরীতে মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মত দিয়েছেন। ২০২৫ সালেও এই সূচকে চীনের অবস্থান ছিল ২৯ শতাংশে।

ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিচারেও চীনের পাল্লা এখন ভারী। প্রতি চারজন উত্তরদাতার মধ্যে তিনজনই মনে করেন, বেইজিংয়ের সাথে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও সুযোগ এখন অন্তত সমান পর্যায়ে রয়েছে। তবে ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঝুঁকির চেয়ে সম্ভাবনার হারই বেশি। এক সময় চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে যে জটিলতার ধারণা প্রচলিত ছিল, সেটিও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এবারের জরিপে ২৯ শতাংশ ব্যবসায়ী চীনের সাথে বাণিজ্য করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন, যা ২০২৫ সালে ছিল ৪১ শতাংশ।

এই ইতিবাচক পরিবর্তনের বিষয়ে কানাডা-চীন চেম্বার অফ কমার্সের প্রেসিডেন্ট জুন ডেং অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, "জরিপের ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, চীনের বাজার থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে কানাডীয় ব্যবসায়ীদের আস্থা প্রতি বছর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।" তিনি আরও যোগ করেন, কানাডা ও চীন যখন তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন আরও বেশি সংখ্যক করপোরেট প্রতিষ্ঠান চীনকে তাদের অন্যতম কৌশলগত গন্তব্য হিসেবে বেছে নিচ্ছে। তারা কেবল বাণিজ্য বৃদ্ধিই নয়, বরং দুই দেশের বিনিয়োগের সম্ভাব্য সুফলগুলোও অনুধাবন করতে শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, এই জরিপটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে (Random Sampling) সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে কানাডায় কর্মরত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানির মধ্যম ও উচ্চ-ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নিয়োজিত ১,০০৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তাদের মতামত প্রদান করেছেন। ওয়াশিংটনের ক্রমাগত চাপের মুখেও কানাডীয় ব্যবসায়ীদের এই বেইজিং-মুখী অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন কোনো মেরুকরণের জন্ম দেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।