ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের ‘নিট’ বিরোধী আন্দোলন এখন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক প্রলয়ংকরী বাকযুদ্ধে। একদিকে জেন-জি প্রজন্মের হার না মানা প্রতিবাদ, অন্যদিকে বলিউড অভিনেত্রী ও বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাউতের একের পর এক বিতর্কিত তীর্যক মন্তব্য। আন্দোলনকারীদের ‘আবর্জনার প্রজন্ম’ এবং ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে অভিহিত করার পর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এক নতুন অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে কঙ্গনার এমন কড়া আক্রমণকে স্রেফ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ।
গত বুধবার (২৯ জুলাই) ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কঙ্গনা রানাউত সম্প্রতি এক সেলফি ভিডিওর মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে, তাঁর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। ভিডিওতে কঙ্গনা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশের আচরণকে ‘অশোভন ও অনৈতিক’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, প্রকাশ্যে নারী, শিশু ও বয়স্কদের সামনে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা কোনোভাবেই সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, রাজপথে এমন অসংলগ্ন আচরণকে সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
কঙ্গনার এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের প্রেক্ষিতে সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর পক্ষ থেকে অভিজিৎ দীপকে প্রশ্ন করা হলে তিনি একবাক্যে অভিনেত্রীর গুরুত্ব নাকচ করে দেন। তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “ওকে আবার সিরিয়াসলি নেয় কে?” সিজেপি নেতার এমন ক্ষুরধার মন্তব্যে স্পষ্ট যে, তাঁরা কঙ্গনার সমালোচনাকে কোনোভাবেই মাঠের আন্দোলনের পথে বাধা মনে করছেন না। বরং এই ধরণের মন্তব্যকে তাঁরা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করার একটি সস্তা কৌশল হিসেবে দেখছেন।
তবে কঙ্গনা রানাউত তাঁর ভিডিওতে এক ধরণের বিভাজন রেখা টানার চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি পুরো ‘জেন-জি’ প্রজন্মকে ঢালাওভাবে আক্রমণ করেননি। তিনি ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর মতো সফল মহাকাশ প্রযুক্তি স্টার্টআপ নির্মাতা এবং যারা কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের হাল ধরছেন, সেই সব আদর্শিক তরুণদের প্রশংসা করতে ভোলেননি। কিন্তু রাজপথে যারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক স্লোগান দিচ্ছেন, তাঁদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনেকের কাছেই অভিভাবক বা অনুপ্রেরণা; তাই এমন মন্তব্য কোটি মানুষের আবেগে আঘাত হানতে পারে।
এই চলমান বিতর্কের মাঝে এক ভিন্নধর্মী ও সংবেদনশীল প্রশ্ন তুলেছেন প্রখ্যাত সংগীতকার ও সুরকার বিশাল দাদলানি। সরাসরি কঙ্গনার নাম উল্লেখ না করলেও তিনি তাঁর ‘স্মার্টফোন’ থেকে করা এক পোস্টে গভীর এক প্রশ্ন তুলেছেন। দাদলানির মতে, আন্দোলনকারীদের ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে যতটা আলোচনা হচ্ছে, তাঁদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর নজিরবিহীন বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারের মতো নিষ্ঠুর পদক্ষেপ নিয়ে কেন ততটা কথা হচ্ছে না? তিনি মনে করেন, কেবল স্লোগানের ভাষা বিচার না করে রাষ্ট্রযন্ত্রের এই দমন-পীড়ন এবং আন্দোলনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সব মিলিয়ে, ভারতের এই ছাত্রবিক্ষোভ এখন কেবল একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়, বরং জেন-জি বনাম রাষ্ট্রশক্তির এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক লড়াইতে রূপ নিয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।