আকাশী-নীল জার্সিতে শেষ হচ্ছে এক মহাকাব্য: অধিনায়কের প্রস্থানে ড্রেসিংরুমে বিষাদের সুর

আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় রচিত হতে যাচ্ছে এক অত্যন্ত আবেগঘন ও ঐতিহাসিক বিদায়ের গল্প। দীর্ঘ দুই দশকের অবিস্মরণীয় পথচলার ইতি টেনে জাতীয় দলের জার্সি চিরতরে তুলে রাখতে যাচ্ছেন আধুনিক ফুটবলের মহাতারকা ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি। আন্তর্জাতিক এই ফিফা উইন্ডোয় অংশ নেওয়ার জন্য ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একে একে নিজ দেশ আর্জেন্টিনায় পা রাখছেন আলবিসেলেস্তে ফুটবলাররা। তবে এবারের ক্যাম্পে দলের আবহ একেবারেই অন্যরকম; ড্রেসিংরুমজুড়ে বিরাজ করছে অধিনায়কের বিদায়ের বিষাদময় সুর। নিজ দেশের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই সতীর্থরা একের পর এক আবেগাপ্লুত বার্তা দিচ্ছেন তাদের সর্বকালের সেরা নেতার প্রতি।

জাতীয় দলে ডাক পাওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে সবার আগে আর্জেন্টিনায় পৌঁছান তরুণ ডিফেন্ডার ভালেন্তিন বার্কো। বেনিনের বিপক্ষে আসন্ন প্রীতি ম্যাচটি নিয়ে রোমাঞ্চের পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে ছিল তীব্র বিষাদের সুর, কারণ এই ম্যাচ দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন মেসি। জনপ্রিয় ক্রীড়া মাধ্যম ইএসপিএন-কে বার্কো বলেন, "আমরা সবাই দারুণ রোমাঞ্চিত এবং আশা করছি তাকে বিদায়বেলায় ভালো কিছু করে দেখাতে পারবো। তাকে ছাড়া জাতীয় দলের কথা কেউ কল্পনাই করতে পারে না, তিনি যে শূন্যতা রেখে যাচ্ছেন তা অনেক বড়, যা পূরণ করা অসম্ভব।"

দলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস তালিয়াফিকো বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "এটা মেনে নিতে হবে, সামনে যা আসছে তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, দল হিসেবে বেড়ে ওঠা চালিয়ে যেতে হবে। এই বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমরা কাটিয়েছি ২০টি বছর। এটা কঠিন হবে, তবে মেনে নিতেই হবে।" একই সঙ্গে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি যোগ করেন, "আমিও আমার শেষ পর্যায়ে আছি, যতটা সম্ভব উপভোগ করার চেষ্টা করছি।"

এদিকে অধিনায়ককে হারানোর খবরে স্পষ্টতই বিমর্ষ দেখাচ্ছিল ফাকুন্দো মেদিনাকে। রোজারিওর এই কিংবদন্তির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, "আমি দুঃখিত, তিনি আমাদের অনেক আনন্দ দিয়েছেন, সব কিছু দিয়েছেন। তিনি একজন মানুষ, তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হবে। সবচেয়ে ভালোভাবে তাকে বিদায় জানাতে হবে এবং তাকে ও তার পরিবারকে এই মুহূর্তটা উপভোগ করতে দিতে হবে। তিনি সবার জন্য একটি উদাহরণ, তার মহত্ব থেকে আমাদের শিখতে হবে।" মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার আকস্মিক সিদ্ধান্ত কীভাবে জেনেছিলেন, তা জানাতে গিয়ে মেদিনা অকপটে বলেন, "তোমাদের সবার মতোই, এটা আমার কাছে বোমার মতো আঘাত করেছিল।"

দলে মেসির অনন্য গুরুত্ব ও প্রভাব তুলে ধরে মিডফিল্ডার এসকিয়েল পালাসিওস বলেন, "লিও আমাদের জন্য অনেক বড় একটা শূন্যতা রেখে যাবে, সে আমাদের অধিনায়ক, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। এই সপ্তাহে তাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তটা উপভোগ করি চলো।" এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে অনুভূতিতে ধারণ করে ফরোয়ার্ড হোসে মানুয়েল লোপেজ বলেন, "আমাদের দেশ এবং ফুটবলের জন্য এটা হতে যাচ্ছে একটা অনন্য মুহূর্ত, ইতিহাস তৈরির মতো কিছু একটা। আমি একইসঙ্গে দুঃখিত এবং আনন্দিত।"

আর্জেন্টিনার নিয়মিত তারকা স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "এটা এমন কিছু যা আমরা আগে থেকেই জানতাম, দুঃখের খবর হলেও শেষ পর্যন্ত লিও আমাদের যা কিছু দিয়েছেন এবং যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন তা নিয়েই আমরা সবসময় আনন্দিত থাকবো।" শেষবেলায় অধিনায়ককে কী বার্তা দেবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্তিনেজ বলেন, "শুধু ধন্যবাদ জানাবো। এই ম্যাচটা হতে যাচ্ছে খুবই বিশেষ এবং রোমাঞ্চকর।"

আর্জেন্টিনার মাটিতে পা রেখে মাঝমাঠের কাণ্ডারি আলেক্সিস মাক আলিস্তার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "শুধুই কৃতজ্ঞতা, এমন আর কেউ হবে না। তার সঙ্গে সময় কাটাতে পেরে এবং তিনি আমাদের জন্য যা কিছু করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত। এটা হতে যাচ্ছে অত্যন্ত আবেগঘন একটা দিন।" পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মেসির অনুপস্থিতি কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি আরও বলেন, "নতুন ছেলেদের নিয়ে এটা হবে একেবারে ভিন্ন একটা প্রক্রিয়া, বুঝতে হবে যে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় আর আমাদের সঙ্গে নেই, যে খেলোয়াড় তফাৎ গড়ে দিতেন তিনি আর নেই। সতীর্থ হিসেবে তার সঙ্গে থাকাটা ছিল সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তার বিনয়ের সেই দিকটা আমরা খুব মিস করবো।"

বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে সুযোগ না পাওয়ার পর আবারও জাতীয় দলে ফিরেছেন তরুণ উইঙ্গার ফ্রাংকো মাস্তান্তুওনো। মেসির শেষ ম্যাচে অংশীদার হতে পেরে গর্বিত এই তরুণ বলেন, "আবার এখানে আসতে পেরে আমি খুবই খুশি। এটা স্পষ্টতই অনেক বিশেষ, কারণ এটা আমাদের অধিনায়কের, আমাদের আদর্শের, আমাদের পতাকার শেষ ম্যাচ। এই ব্যাপারে আমি আনন্দিত।"

চলমান এই ফিফা উইন্ডোয় ঘরের মাঠে নিজেদের চেনা সমর্থকদের সামনে বলিভিয়া, বুরকিনা ফাসো এবং বেনিনের বিপক্ষে তিনটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের সিরিজে মাঠে নামবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কোচ লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা অর্থাৎ ‘স্কালোনেতা’র প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে কর্ডোবার মারিও আলবের্তো কেম্পেস স্টেডিয়ামে। এরপর সিরিজের শেষ দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহাসিক বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে। আর আগামী ৫ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে এই মনুমেন্তালের মাঠেই শেষবারের মতো আকাশী-নীল জার্সিতে বুট জোড়া তুলে রেখে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরবিদায় জানাবেন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।