বিশ্ববিখ্যাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এখন এক নজিরবিহীন জনরোষ ও ব্যবসায়িক সংকটের মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের অত্যন্ত গোপনীয় সরকারি নেটওয়ার্কে নিজেদের এআই মডেল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরপরই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। প্রভাবশালী ব্যবসায়িক সাময়িকী ফোর্বস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই বিতর্কিত ঘোষণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ লাখেরও বেশি প্রিমিয়াম ব্যবহারকারী তাঁদের চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেছেন। যদিও গ্রাহক হারানোর এই বিপুল সংখ্যার বিষয়ে ওপেনএআই এখন পর্যন্ত দাপ্তরিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এই সংকটের মূলে রয়েছে প্রযুক্তি ও যুদ্ধের মধ্যকার নৈতিক সংঘাত। পেন্টাগনের সাথে ওপেনএআই-এর সম্পাদিত এই নতুন চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও সংরক্ষিত ব্যবস্থায় ব্যবহারের সুযোগ পাবে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ অভিযোগ তুলছেন যে, মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে তৈরি করা এই প্রযুক্তি এখন পরোক্ষভাবে সামরিক অভিযান বা যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। শুধু পেন্টাগন চুক্তিই নয়, ওপেনএআই-এর প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান কর্তৃক ‘ম্যাগা ইনক’ (MAGA Inc)-কে ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার খবর এবং এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (ICE) সাথে চুক্তি—এই তিনটি বিষয় মিলেই গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।
এদিকে ওপেনএআই-এর এই বিপর্যয়ের সুযোগে ফুলেফেঁপে উঠছে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’ (Anthropic)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিক কর্তৃপক্ষ মার্কিন সরকারকে তাদের মডেলে ‘অসীমিত প্রবেশাধিকার’ দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের এই দৃঢ় ও নৈতিক অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে। এর ফলে ক্ষুব্ধ চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীরা দলে দলে অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড’ (Claude) চ্যাটবটের দিকে ঝুঁকছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত সপ্তাহান্তে অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে ডাউনলোড তালিকার শীর্ষে উঠে আসে ক্লড, যা সাময়িকভাবে জনপ্রিয়তায় চ্যাটজিপিটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিলিকন ভ্যালির এই ‘এআই যুদ্ধ’ এখন আর কেবল প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন ‘নৈতিকতা বনাম মুনাফা’র লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ওপেনএআই-এর মতো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এত দ্রুত এত বিপুল সংখ্যক ‘পেইড কাস্টমার’ বা গ্রাহক হারানো বড় ধরণের আর্থিক ও ইমেজ সংকটের ইঙ্গিত দেয়। গ্রাহকদের এই গণ-প্রস্থান দীর্ঘমেয়াদে বাজারের প্রতিযোগিতায় কী প্রভাব ফেলে এবং স্যাম অল্টম্যানের নেতৃত্বাধীন এই প্রতিষ্ঠান তাদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।