প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে সাইবার অপরাধীরা এখন মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোনকেই তাঁদের সবচাইতে বড় শিকারে পরিণত করছে। আপনার ফোনের সিগন্যাল বার পূর্ণ দেখাচ্ছে, নেটওয়ার্কও নির্বিঘ্নে ‘ফাইভ-জি’ মুডে রয়েছে—ঠিক এমন সময় হঠাৎ একটি খুদে বার্তা বা এসএমএস এলো। বার্তায় বলা হলো, ‘ব্যাংকের কেওয়াইসি (KYC) আপডেট না করলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’ অথবা ‘বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে’। বার্তাটি এতটাই পেশাদারী ঢঙে লেখা যে, সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে একে ভুয়া বলে সন্দেহ করা প্রায় অসম্ভব। মূলত এখানেই লুকিয়ে আছে প্রযুক্তিনির্ভর এক ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ, যেখানে আপনার অজান্তেই ফোনটিকে একটি ‘ভুয়া টাওয়ারের’ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়।
তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের মতে, প্রতারকরা এখন ‘এসএমএস ব্লাস্টার’ (SMS Blaster) বা ‘আইএমএসআই ক্যাচার’ (IMSI Catcher) নামক এক বিশেষ পোর্টেবল ডিভাইস ব্যবহার করছে। এই যন্ত্রটি আকারে ছোট এবং সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় জনবহুল এলাকায় অপরাধীরা এটি অতি সহজেই ব্যবহার করতে পারে। এই ডিভাইসটি নিজেকে একটি বৈধ মোবাইল টাওয়ার হিসেবে পরিচয় দেয় এবং প্রায় ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকা সব ফোনকে নিজের শক্তিশালী সিগন্যালে টেনে নেয়। সবচাইতে আতঙ্কের বিষয় হলো, উচ্চগতির ফাইভ-জি বা ফোর-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারী ফোনগুলোকে এই যন্ত্রটি জোরপূর্বক অত্যন্ত অসুরক্ষিত ‘টু-জি’ (2G) নেটওয়ার্কে নামিয়ে আনে। ব্যবহারকারী স্ক্রিনের দিকে না তাকালে বুঝতেই পারেন না যে তাঁর নেটওয়ার্ক মুড পরিবর্তন হয়ে গেছে।
প্রতারকরা কেন টু-জি নেটওয়ার্ক বেছে নিচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে গাণিতিক কৌশল। টু-জি নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় এখানে প্রেরকের পরিচয় বা ‘সেন্ডার আইডি’ (Sender ID) জাল করা খুব সহজ। এর ফলে প্রতারকরা ব্যাংকের নাম বা সরকারি দপ্তরের নাম ব্যবহার করে এমনভাবে এসএমএস পাঠাতে পারে যা গ্রাহকের ফোনে হুবহু অফিসিয়াল বার্তার মতো দেখায়। এসব বার্তায় মূলত ভয় বা বিশাল লোভের টোপ দেওয়া হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধের হুমকি, রিওয়ার্ড পয়েন্ট জেতা কিংবা ঘরে বসে মোটা অংকের আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একটি ‘লিংক’ পাঠানো হয়। সেই লিংকে ক্লিক করলেই ব্যবহারকারীর অজান্তে ফোনের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে চলে যায় এবং ওটিপি (OTP) ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে নিমিষেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শূন্য করে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI) দিল্লি, নয়ডা ও চণ্ডীগড়ে অভিযান চালিয়ে এমন একটি বড় চক্রকে গ্রেপ্তার করে, যারা প্রতিদিন লাখ লাখ ভুয়া বার্তা পাঠাত। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সাইবারাবাদ পুলিশ আরও ২৫ জনকে আটক করে, যারা সরাসরি বিদেশি অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনবহুল এলাকায় এই ‘এসএমএস ব্লাস্টার’ ব্যবহার করছিল। এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই ধরনের সাইবার প্রতারণা প্রায় ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার কোটি রুপিরও বেশি।
এই অভিনব ও ভয়ংকর প্রতারণা থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, স্মার্টফোনের সেটিংস অপশনে গিয়ে ‘টু-জি কানেক্টিভিটি’ পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া হুট করে ফোন ফাইভ-জি থেকে টু-জি মুডে চলে গেলে তক্ষুনি সতর্ক হতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই অচেনা লিংকে ক্লিক করা যাবে না। ব্যাংক বা সরকারি যেকোনো কাজের জন্য কেবল অফিসিয়াল অ্যাপ এবং অনুমোদিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করা উচিত। প্রযুক্তির যুগে সামান্য সচেতনতা ও ধৈর্যই পারে আপনার কষ্টার্জিত অর্থকে এই ডিজিটাল লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা করতে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।