সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থব্যয়ে নির্মিত ‘মডেল মসজিদ’ প্রকল্পের অন্যতম স্থাপনা চুয়াডাঙ্গা জেলা মডেল মসজিদ এখন অযত্ন আর প্রশাসনিক রশি টানাটানির কবলে পড়ে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় আধুনিক এই ধর্মীয় স্থাপনাটির অবকাঠামোগত ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং গভীর প্রশাসনিক জটিলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের ১৭ জুন প্রায় ১৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মসজিদটির উদ্বোধন করা হয়েছিল। অথচ সময়ের ব্যবধানে বর্তমানে এর বিভিন্ন অংশের টাইলস খুলে পড়ছে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং পাইপলাইনের লিকেজ থেকে শুরু করে নানাবিধ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের অজুখানার পানির লাইনে দীর্ঘদিনের লিকেজ সারাই না করায় দেয়ালের টাইলস ও প্লাস্টার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, নিরাপত্তার জন্য বসানো ৩০টি সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার সবগুলোই প্রায় এক বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। সম্প্রতি নিজস্ব উদ্যোগে মাত্র চারটি নতুন ক্যামেরা বসানো হলেও তা বিশাল এই স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত কোনো নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় বাথরুমের মূল্যবান ট্যাপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনা নিত্যদিনের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
মসজিদটির আর্থিক চিত্র আরও ভয়াবহ। জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিল বাবদ পিডিবি’র কাছে প্রায় ৯ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র এক দফায় ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। দ্রুত এই বিপুল অঙ্কের বকেয়া পরিশোধ না করা হলে যেকোনো সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মুসল্লিদের চরম ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
মসজিদটির মুয়াজ্জিন মো. মনজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "পাঁচ বছর পার না হতেই আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাথরুমের অধিকাংশ ট্যাপ চুরি হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় একা সব সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। আমি অনেক জায়গায় ব্যক্তিগত অর্থায়নে পাইপ মেরামত করেছি। এছাড়া মসজিদের সামনে পৌরসভা থেকে নিয়মিত ময়লা ফেলা হয়, যার দুর্গন্ধে মুসল্লিদের নামাজে আসতে সমস্যা হচ্ছে।" স্থানীয় মুসল্লি শাহিন আক্তার বলেন, সরকারি এত টাকা খরচের পর যদি এমন বেহাল দশা হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত সংস্কার না করলে এই সম্পদ নষ্ট হয়ে যাবে।
এই অচলাবস্থার বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক এ কে এম শাহীন কবীর জানান, মসজিদটি গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হলেও ২০২৪ সালে তা তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাঁদের কাছে আলাদা কোনো ‘বাজেট’ বা বরাদ্দ নেই। নিজ উদ্যোগে কয়েকটি ক্যামেরা বসানো হলেও বিদ্যুৎ বিল মেটাতে তাঁরা সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় আছেন।
অন্যদিকে, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহসিন দায়ভার এড়িয়ে বলেন, "প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের ছিল এবং হস্তান্তরের এক বছর আগে পর্যন্ত আমরা মেরামত ব্যয় বহন করেছি। এখন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনের। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের হাতে এ খাতের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই।"
দুই সরকারি দপ্তরের এই সমন্বয়হীনতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ। স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের দাবি, অবিলম্বে সিসিটিভি সচল করা হোক, বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো সংস্কার করে মসজিদের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।