স্বপ্ন ছিল নতুন বাড়ির, ফিরলেন কফিনে; গফরগাঁওয়ে রেমিট্যান্স যোদ্ধার দাফন সম্পন্ন

মরুভূমির তপ্ত বালু গায়ে মেখে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর প্রবাসে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই স্বপ্ন পুড়ল ক্ষেপণাস্ত্রের আগুনে। সৌদি আরবে ভয়াবহ মিসাইল হামলায় প্রাণ হারানো ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান আবদুল্লাহ আল মামুনের (৩৫) মরদেহ দীর্ঘ ২০ দিন পর অবশেষে তার প্রিয় জন্মভূমিতে এসে পৌঁছেছে। সোমবার (১ এপ্রিল) আসরের নামাজের পর নিজ গ্রাম রসুলপুর ইউনিয়নের ভরভরায় পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।

এর আগে, সোমবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের ‘এসভি-৮০৬’ ফ্লাইটে মামুনের নিথর দেহটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় যখন নিহত কর্মীর পরিবারের সদস্যরা কফিনটি গ্রহণ করতে সেখানে উপস্থিত হন। এসময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং কফিন হস্তান্তর করেন। মন্ত্রী মহোদয় শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের দাপ্তরিক ও আর্থিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ৮ মার্চ সৌদি আরবের আল খারিজ শহরে আল তোয়াইক বলদিয়া কোম্পানির একটি শ্রমিক ক্যাম্পে ইফতারের আগমুহূর্তে আচমকা ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ ঘটে। সেই হামলায় গুরুতর জখম হন মামুন। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে আল খারিজ শহরের ডাক্তার সোলাইমান আল হাবিব হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ নয় দিন যমে-মানুষে লড়াই করার পর ১৭ মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে মা শাহিদা বেগম বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, ‘আমার ছেলেটা বলেছিল এবার দেশে এসে নতুন বাড়ি করবে। এখন আমার ছেলের বাড়ি হলো কবরে!’ বাবা শহীদ সওদাগরের কণ্ঠেও ঝরছিল বুকফাটা হাহাকার। তিনি জানান, আট বছর আগে ভাগ্য অন্বেষণে সৌদি আরব গিয়েছিলেন মামুন। পাঁচ বছর আগে শেষবারের মতো বাড়িতে এসেছিলেন। কথা ছিল এবারের কোরবানির ঈদের পর এসে নতুন ঘরের কাজ ধরবেন, কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।

নিহত মামুনের স্ত্রী সাদিয়া ইসলাম শারমীন একজন উচ্চশিক্ষিত নারী, তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাদের একটি অবুঝ ছেলেসন্তান রয়েছে। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে দিশেহারা শারমীন এখন তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমি আজ বিধবা, আমার সন্তান এতিম। এখন পরিবারের হাল ধরার মতো কেউ নেই। সরকার যদি আমার যোগ্যতানুসারে একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিত, তবে আমি আমার সন্তানকে মানুষ করতে পারতাম।’ এলাকাবাসীও পরিবারের এই দুঃসময়ে মামুনের স্ত্রীর কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া