যৌতুকের করাল গ্রাসে আরও একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার তিন বছর পর ন্যায়বিচার পেলেন ভুক্তভোগী পরিবার। ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে নিজের স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যার দায়ে ঘাতক স্বামী রাশেদ মোল্লাকে (৩১) আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে আদালত তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।
আজ সোমবার (তারিখ অনুযায়ী) বেলা একটার দিকে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শামীমা পারভীন জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাশেদ মোল্লা কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। সাজা ঘোষণার পর কঠোর পুলিশি পাহারায় তাকে জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আমৃত্যু কারাদণ্ড ছাড়াও পেনাল কোডের অপর একটি ধারায় আসামিকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে আদালতের নির্দেশানুযায়ী, উভয় ধারার কারাদণ্ড একই সঙ্গে কার্যকর হবে।
মামলার লোমহর্ষক বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে ফরিদপুর সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের ঘোড়াদহ বাজারের বাসিন্দা রাশেদ মোল্লার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের জোসনা বেগমের (২১)। বিয়ের শুরু থেকেই রাশেদ যৌতুকের নেশায় মত্ত ছিলেন। ইতিপূর্বে ৫০ হাজার টাকা যৌতুক নিলেও তার চাহিদা শেষ হয়নি। এমনকি স্ত্রীর সোনার গয়না বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে মাদক সেবনের মতো গর্হিত কাজেও লিপ্ত ছিলেন এই যুবক।
নৃশংসতার চূড়ান্ত পর্যায়ে, ২০২০ সালের ১৬ জুলাই পুনরায় ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন রাশেদ। জোসনা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। একপর্যায়ে রাশেদ ঘরে থাকা কেরোসিন তেল জোসনার শরীরে ঢেলে দিয়ে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। অগ্নিদগ্ধ জোসনার আর্তনাদে প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১৭ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
এই ঘটনায় জোসনার বড় ভাই জলিল শেখ বাদী হয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আরিফুজ্জামান ২০২১ সালের ১৪ মার্চ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
আদালতের পিপি গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই রায় সমাজে যৌতুকলোভীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা। অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় রাশেদের ভাই হাসিব মোল্লাকে খালাস দেওয়া হয়েছে, তবে মূল অপরাধী রাশেদকে তার কৃতকর্মের জন্য আমৃত্যু অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই কাটাতে হবে।”
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।