ভিডিও ভাইরাল থেকে রক্তক্ষয়ী হামলা; দৌলতপুরে পীর শামীম খুনের নেপথ্যে কী?

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে এক পীরের দরবারে চালানো নারকীয় হামলার রেশ এখনো কাটেনি। রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে সরজমিনে দেখা যায়, হামলার শিকার সেই দরবার শরীফের ধ্বংসাবশেষ থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। গত শনিবারের সেই রক্তক্ষয়ী তাণ্ডবের পর পুরো এলাকা জুড়ে বিরাজ করছে এক শ্বাসরুদ্ধকর স্তব্ধতা। হামলায় আহত নারীরা এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত যে, তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেও ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছেন।

শনিবার দুপুরে পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরের দরবারে একদল উত্তেজিত জনতা অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের একটি মিছিল স্লোগান দিতে দিতে দরবারের দিকে অগ্রসর হয়। তারা দরবারের দুটি পাকা দালানের ভেতর ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে দরবারের দুটি আধা-পাকা ঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে ছাই হয়ে গেছে। রোববার সকালেও একটি ঘর থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকলেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে এখনো বিভীষিকার ছাপ স্পষ্ট।

নিহত পীর শামীম রেজার বড় ভাই ফজলুর রহমান, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক, ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, শনিবার জোহরের নামাজ শেষ করে বাড়িতে খাবার খাওয়ার সময় তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পান। বাইরে বেরিয়ে দেখেন, তার ভাইকে দোতলা থেকে টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামিয়ে একদল মানুষ এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত করছে। ফজলুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাই যদি কোনো অপরাধ করে থাকত, তবে তার বিচার আইনত হতে পারত; কিন্তু এভাবে একজন মানুষকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

গুরুতর আহত অবস্থায় শামীম রেজাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই শামীম রেজার মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিহতের মরদেহ বর্তমানে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল কয়েক বছর আগের একটি বিতর্কিত ভিডিওকে কেন্দ্র করে। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে পীর শামীম রেজা পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। গত শুক্রবার সকাল থেকে সেই পুরোনো ভিডিওটি পুনরায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরই জেরে শনিবার সকালে আবেদের ঘাট এলাকায় কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে দরবারের দিকে অগ্রসর হয় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

নিহতের পরিবার এখনো মামলা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফজলুর রহমান জানান, ভাইয়ের মরদেহ বাড়িতে আনার পর জানাজা ও দাফন শেষে পরিবারের সবাই মিলে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে জানাজায় অংশ নেওয়া নিয়ে কোনো বাধা আসলে তারা ভাইয়েরা মিলে জানাজা সম্পন্ন করবেন বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিরাজ করছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া