ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপদে শুরু হয়েছে এক অনন্য উৎসবের আমেজ। হাতে বাহারি বুনো ফুল আর অঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল পোশাক-সব মিলিয়ে পাহাড় আজ যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। পুরাতন বছরের সকল গ্লানি মুছে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে আজ রবিবার ভোরে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ আর বান্দরবানের সাঙ্গু নদে ঢল নেমেছে পাহাড়ি জনমানুষের। ধর্মীয় আচার আর সামাজিক সম্প্রীতির মেলবন্ধনে শুরু হয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রধান উৎসব ‘ফুল বিজু’।
কেবল রাঙামাটি বা বান্দরবান নয়, বরং খাগড়াছড়িসহ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামেই এখন সাজ সাজ রব। পাহাড়ি জনপদে সম্প্রদায়ভেদে এই উৎসবের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। আজ রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ‘ফুল বিজু’ উৎসব। এই দিনটি মূলত প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং দেবতার কাছে আগামী দিনের মঙ্গল কামনার দিন। নিয়ম অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার থেকে মারমা জনগোষ্ঠীর ‘সাংগ্রাই’, ম্রোদের ‘চাংক্রান’, খেয়াংদের ‘সাংলান’, খুমিদের ‘চাংক্রাই’ এবং চাকদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।
আজ সকাল থেকেই রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন ঘাট ও শহরের কেরানি পাহাড় এলাকায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলা হ্রদের পানিতে পরম মমতায় ফুল ভাসাতে দেখা যায় সব বয়সী মানুষকে। উৎসবে আসা মন্দা তঞ্চঙ্গ্যা আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “ফুল বিজুর এই আনন্দ আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ।” শহরের হ্যাচারি এলাকা থেকে সপরিবারে আসা শর্মিষ্ঠা চাকমা ও শিখা চাকমা জানালেন তাঁদের প্রার্থনার কথা। জবা, চম্পা, কাগজ ফুল, কলমি, টগর আর মাধবী লতার মতো হরেক পদের ফুল পানিতে ভাসিয়ে তাঁরা ‘মা গঙ্গার’ কাছে পরিবার ও দেশের সুখ-শান্তি কামনা করেন।
ফুল বিজুর প্রথা অনুযায়ী, সূর্যোদয়ের লগ্নে নদীর ঘাটে বা জলাশয়ে পানির দেবতার উদ্দেশে পূজা অর্পণ করা হয়। কলাপাতায় ফুল ও প্রদীপ সাজিয়ে নদী, ছড়া কিংবা পুকুরে ভাসিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি অত্যন্ত নয়নাভিরাম। দেবতাকে নিবেদন করা ভোগের থালায় থাকে আতপ চাল, ফলমূল আর গুড়-চিনির মিষ্টান্ন। ঘরের প্রতিটি কোণ এদিন সাজানো হয় তাজা ফুলে। এছাড়া সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে তরুণ-তরুণীরা গ্রামের প্রবীণদের গোসল করিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।
বান্দরবানের সাঙ্গু নদের মারমা বাজার ঘাটেও আজ ছিল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যানার বা সংগঠনের আয়োজন ছাড়াই শত শত নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে নদীতে ফুল নিবেদন করেন। বান্দরবান নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষক নমিতা তঞ্চঙ্গ্যা এই আচারের গভীর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, “এটি কেবল একটি লোকজ উৎসব নয়। আমরা গঙ্গা মাকে ফুল নিবেদনের মাধ্যমে বিদায়ী বছরের সকল জানা-অজানা ভুলের জন্য ক্ষমা চাই এবং নতুন বছরের সমৃদ্ধির জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করি।”
ফুল বিজুর এই বর্ণিল সূচনার পর আগামীকাল সোমবার পালিত হবে ‘মূল বিজু’। সেই দিনটির প্রধান আকর্ষণ হলো ঐতিহ্যের ‘পাজন’ বা ‘পাঁজন’ রান্না। জুমের আলু, কচি বাঁশের ডগা (বাঁশকোড়ল), কাঁচা কাঁঠাল, বুনো ওল, মটর ও নানা পদের গ্রীষ্মকালীন সবজির সংমিশ্রণে তৈরি এই খাবারটি পাহাড়ের ঘরে ঘরে তৈরি হবে। বিজু বা সাংগ্রাই কেবল একটি উৎসব নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের জীবনদর্শন ও প্রকৃতির সাথে তাঁদের নিবিড় সম্পর্কের এক পরম বহিঃপ্রকাশ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।