জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া-কামালপুর স্থলবন্দরটি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ তিন মাস ধরে ভারত থেকে পাথর আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। আমদানির চাকা থমকে যাওয়ায় কেবল সরকারই বিশাল অংকের ‘রেভিনিউ’ বা রাজস্ব হারাচ্ছে না, বরং কাজ হারিয়ে প্রায় আট হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক বর্তমানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বন্দরটি থেকে প্রতি বছর গড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০টি পাথর বোঝাই ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করত, যা বন্দর এলাকাকে সরগরম রাখত। কিন্তু গত ৯০ দিন ধরে সেই পরিচিত ব্যস্ততা এখন অতীত।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভারতীয় অংশে কাঁচা ও ভাঙাচোরা সড়ক এবং ওপারকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে পাথর সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে বন্দরের অতিরিক্ত শুল্ক বা ‘কাস্টমস ডিউটি’ আদায়ের ফলে আমদানিকারকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক ব্যবসায়ী এই মুহূর্তে পাথর আনতে নিরুৎসাহিত বোধ করছেন।
বন্দরের শ্রমিক মনু মিয়া তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থলের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলেন, “তিন মাস আগেও এই বন্দরে আমরা প্রায় ৮ হাজার মানুষ কাজ করে সংসার চালাতাম। এখন আমরা পুরোপুরি বেকার। ঘরে খাবার নেই, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাধ্য হয়ে অনেক শ্রমিক কাজের সন্ধানে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন।” আরেক শ্রমিক কামরুল হোসেন তার কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় তারা পাথর ভাঙার কাজও করতে পারছেন না। প্রতিদিনের বাজার করা কিংবা এনজিও বা সমিতির কিস্তি পরিশোধ করা এখন তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত আমদানি কার্যক্রম শুরু না হলে এই শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল এই অচলাবস্থার জন্য নীতিগত সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি জানান, পাথরের সঙ্গে মাটির শুল্ক ও অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত নতুন করে আমদানি চালু করা ব্যবসায়ীদের জন্য অসম্ভব। এই পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় আট হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুল্ক বিভাগের সহানুভূতি ও সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করে বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে জানানো হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা প্রীতিময় কান্তি বড়ুয়া পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে জানান, ভারতীয় অংশে ভাঙা সড়কসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসান এড়াতে আমদানি বন্ধ রেখেছেন। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং তাদের আমদানিতে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে।
ধানুয়া-কামালপুর বন্দরের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৪ সালে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন এই স্থানে একটি কাস্টমস স্টেশন চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের মে মাসে এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৯ সালে সরকার প্রায় ৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে এখানে আধুনিক ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা অবকাঠামো নির্মাণ করে। বিভিন্ন পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও এই বন্দরের মূল প্রাণভোমরা হচ্ছে পাথর আমদানি। বর্তমানে সেই পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ ও হাজারো মানুষের জীবিকা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।