শীতের শেষে দিগন্তজোড়া হলদে ফুলের সমারোহ যেন পাল্টে দিয়েছে সিরাজগঞ্জের চিরচেনা ভূপ্রকৃতি। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলা সিরাজগঞ্জ এখন সরিষা উৎপাদনে দেশের মানচিত্রে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ সরিষার আবাদ জেলার কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রভাবে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১ দশমিক ৬২ মেট্রিকটন সরিষা উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ আশা প্রকাশ করছে যে, বর্তমান উৎপাদন ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিকটন সরিষা উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসেই অর্জিত হবে।
মাঠ পর্যায়ে সরিষার বাম্পার ফলনে কৃষকদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি। উল্লাপাড়া উপজেলার নাগরৌহা গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ সোবাহান তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, এ বছর ফলন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং তিনি প্রতি বিঘা জমি থেকে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ মণ হারে সরিষা পাচ্ছেন। সরিষার বাজারেও এখন বেশ রমরমা অবস্থা বিরাজ করছে। সরিষার ব্যাপারী আজিজুল জানান, স্থানীয় হাটগুলোতে ইতিমধ্যেই নতুন সরিষা আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে গুণগত মানভেদে প্রতি মণ সরিষা ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য বেশ লাভজনক।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্না ইয়াসমিন সুমি এই অভূতপূর্ব সাফল্যের নেপথ্যে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের পরিশ্রমকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এ বছর প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় সরিষার ফলন হয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। এই বাম্পার ফলনই সিরাজগঞ্জকে সরিষা উৎপাদনের লড়াইয়ে দেশের শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।” তিনি আরও জানান, কেবল উল্লাপাড়া উপজেলাতেই চলতি মৌসুমে ২৪ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজার ১৩০ হেক্টর জমির ফসল ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮৫ মেট্রিকটন।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মওলা বলেন, ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে সিরাজগঞ্জ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা কৃষকদের সরিষা চাষে উৎসাহিত করতে সার ও উন্নত জাতের বীজ প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করেছি। মূলত সঠিক পরামর্শ ও সরকারি সহযোগিতার ফলেই জেলায় সরিষা চাষে এই বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হয়েছে।”
হলুদ ফুলে ঢাকা চলনবিলের এই বিশাল জনপদ এখন কেবল দৃশ্যশোভাই বাড়াচ্ছে না, বরং সরিষার এই বাম্পার ফলন সিরাজগঞ্জকে দেশের ‘সরিষা ভাণ্ডার’ হিসেবে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।