উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো কক্সবাজারের রামু উপজেলার তিন তরুণের ভাগ্য নির্ধারণ হলো অত্যন্ত করুণ ও বিভীষিকাময় পরিনতির মধ্য দিয়ে। মানবপাচারকারী দালালের অমানুষিক নির্যাতনে প্রাণ হারানো আব্দুল্লাহ কাজল নামের এক তরুণের মরদেহ দীর্ঘ দেড় মাস পর অবশেষে নিজ গ্রামে ফিরেছে। একই ঘটনায় অপর এক বন্ধু ক্ষত-বিক্ষত শরীরে ‘আধমরা’ অবস্থায় দেশে ফিরলেও অন্যজন এখনো বন্দি রয়েছেন বিদেশের কারাগারে। এই রোমহর্ষক ঘটনাটি উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
নিহত কাজলের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার মাস আগে রামুর পেঁচার দ্বীপ গ্রামের দুই সহোদর শফিউল আলম (শফি দালাল) ও রফিক আলমের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন কাজল এবং তার দুই সহপাঠী ফারুক ও জাহাঙ্গীর। তাদের প্রত্যেকের বয়স ছিল মাত্র ১৭ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। শফি দালাল বাংলাদেশে বসে প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের সংগ্রহ করে টেকনাফ হয়ে সাগরপথে পাচার করত, আর মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত তার ভাই রফিক দালাল তাদের জিম্মি করে ‘টর্চার সেল’ বা বন্দিশালায় আটকে রাখত।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর রফিক দালাল জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। দাবিকৃত অর্থের মধ্যে সাড়ে ৪ লাখ টাকা কাজলের পিতা মোহাম্মদ ইসমাঈল বাংলাদেশে অবস্থানরত শফি দালালের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু শফি সেই টাকা তার ভাই রফিককে না পাঠিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করেন। টাকার আপডেট না পেয়ে মালয়েশিয়ায় রফিক একদল রোহিঙ্গার সহায়তায় কাজলের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। টানা নির্যাতনের একপর্যায়ে কাজল মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ পাশের একটি ড্রেনে ফেলে দেওয়া হয়।
নিহত কাজলের পিতা মোহাম্মদ ইসমাঈল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “কাজল আমার একমাত্র ছেলে ছিল। অনেক কষ্টে জোগাড় করা সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার পরও শফি দালালের বিশ্বাসঘাতকতায় আমার ছেলেকে মরতে হলো। যদি সে সময়মতো টাকা পাওয়ার কথা তার ভাইকে জানাত, তবে হয়তো আজ কাজল বেঁচে থাকত।”
গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়া থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরে আসা বন্ধু ফারুকের বয়ানে উঠে এসেছে সেখানকার পৈশাচিক নির্যাতনের চিত্র। ফারুক জানান, রফিক দালালের গড়ে তোলা ৮-১০ জনের একটি সশস্ত্র রোহিঙ্গা বাহিনী তাদের ওপর দিনরাত শারীরিক নির্যাতন চালাত। কাজলের মৃত্যুর পর ফারুককে একটি হাসপাতালে ফেলে দেওয়া হয় এবং জাহাঙ্গীরকে তুলে দেওয়া হয় মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে। ফারুক কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও জাহাঙ্গীর এখনো বিদেশের জেলখানায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) কাজলের নিথর দেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শনিবার কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে ‘পোস্টমর্টেম’ বা ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেলে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ বিষয়ে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, নিহত তরুণের পিতা ইতিপূর্বেই আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেছেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। পিবিআইয়ের তত্ত্বাবধানেই ময়নাতদন্ত শেষ করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই মানবপাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।