পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে লাখো মানুষ। কিন্তু ঈদযাত্রার চিরচেনা সেই যানজট আর দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি এবারও পিছু ছাড়েনি ঘরমুখো যাত্রীদের। যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশ থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত পুরো রাস্তায় ধীরগতিতে, আর কোথাও কোথাও একেবারেই থেমে থেমে চলছে গাড়ি। ফলস্বরূপ, চরম দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই গন্তব্যের দিকে এগোতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের মির্জাপুর উপজেলার কদিমধল্যা থেকে করটিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি ইচাইল থেকে কদিমধল্যা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় থেমে থেমে যানজট ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। কাঠফাটা রোদ আর রাস্তার এই অচলাবস্থায় বাসের ভেতরে বসে থাকা শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের কষ্ট বর্ণনাতীত রূপ নিয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে মহাসড়কের চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। রাস্তার ওপর কেবলই যানবাহনের দীর্ঘ সারি, চাকা যেন ঘুরতেই চাইছে না। কালিহাতী উপজেলার পৌলী সেতু এলাকায় কথা হয় রাজশাহীগামী বাসের চালক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি জানান, আজ ভোর পাঁচটায় ঢাকা থেকে বাস ছেড়ে টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরে থাকার পর মাত্র টাঙ্গাইল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন। সাভার ও চন্দ্রা এলাকায় তাঁকে দীর্ঘ সময় তীব্র যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। ওই এলাকা পেরোনোর পর গাড়ি আর পুরোপুরি থেমে না থাকলেও, প্রচণ্ড ধীরগতিতে পথ চলতে হচ্ছে তাঁকে।
একই রকম হতাশার সুর শোনা গেল টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের রাবনা মোড়ে অপেক্ষারত বগুড়াগামী বাসের যাত্রী আশরাফ আলীর কণ্ঠে। তিনি জানান, সাভারের বাইপাইল থেকে রওনা হয়ে সাড়ে তিন ঘণ্টায় তিনি টাঙ্গাইল পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। অথচ রাস্তা ফাঁকা থাকলে স্বাভাবিক সময়ে এই পথটুকু পাড়ি দিতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগে।
আজ সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন ‘পয়েন্ট’—বিশেষ করে মির্জাপুর, কুর্নি, কদিমধল্যা ও পাকুল্যা বাসস্ট্যান্ড এলাকা ঘুরে তীব্র যানজটের এই অভিন্ন দৃশ্যই চোখে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর থেকেই মহাসড়কের মির্জাপুর উপজেলার ক্যাডেট কলেজ থেকে জামুর্কী পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপরই যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। রাতে যানবাহনের চাপ আরও বাড়লে গতির কাঁটা একেবারে নেমে আসে। রাত সাড়ে তিনটার পর থেকে ওই নির্দিষ্ট অংশে যানজট এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে, মাঝেমধ্যেই প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।
তবে আজ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই যানজট কিছুটা কমে আসতে শুরু করে। বাসের টিকিট না পেয়ে বা যানজট এড়াতে অনেক মরিয়া যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেল, ট্রাক, খোলা পিকআপ এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কদিমধল্যা আন্ডারপাসের ওপরে কথা হয় পণ্যবাহী ট্রাকের চালক গোলাম হোসেনের সঙ্গে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে তিনি জানান, গতকাল মাগরিবের নামাজের পরপরই তিনি নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন থেকে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সারা রাত রাস্তায় ‘ঠেলতে ঠেলতে’ আজ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি গাজীপুরের চন্দ্রা পৌঁছান। চন্দ্রার তুলনায় মহাসড়কের মির্জাপুর অংশে যানজটের তীব্রতা কিছুটা কম বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, কদিমধল্যাতে তিনি প্রায় ১০ মিনিট ধরে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছেন।
অন্যদিকে, রাজশাহীগামী স্বনামধন্য পরিবহন সংস্থা হানিফ এন্টারপ্রাইজের বাসচালক মোহাম্মদ আখিল নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাত্রী বোঝাই করে আজ সকাল ৬টায় তিনি ঢাকা থেকে রওনা হয়েছেন। কিন্তু পৌনে চার ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তিনি মির্জাপুরের কদিমধল্যা অংশটুকু অতিক্রম করতে পারেননি। অথচ যানজট না থাকলে অন্য সময় এইটুকু রাস্তা পার হতে তাঁর সর্বোচ্চ দেড় ঘণ্টা সময় লাগত।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে হাইওয়ে পুলিশের এলেঙ্গা ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনচার্জ) মো. শরীফ দেশ মিডিয়াকে বলেন, "ঈদের কারণে গাড়ির অতিরিক্ত চাপ থাকায় মহাসড়কে ধীরগতিতে যানবাহন চলছে ঠিকই, তবে দীর্ঘ সময় কোথাও একেবারে থেমে থাকতে হচ্ছে না। যানজট নিরসন ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।"
এদিকে, যমুনা সেতুর টোল প্লাজা সূত্রে যানবাহনের বিপুল চাপের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র পাওয়া গেছে। সূত্রটি জানায়, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে বুধবার দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত—এই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকাগামী মোট ১৮ হাজার ৭৪৪টি যানবাহন যমুনা সেতু পার হয়েছে। এ সময় টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৫০ টাকা। এর বিপরীতে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের চাপ ছিল অনেক বেশি। এই সময়ে মোট ৩২ হাজার ৮৪০টি উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন সেতু পার হয়েছে, যা থেকে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার ৬৫০ টাকা।
ঈদযাত্রায় টোল আদায়ে যাতে কোনো দীর্ঘসূত্রতা না হয়, সে বিষয়ে যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, "যানবাহনের চাপ সামলাতে যমুনা সেতুর দুই পাশেই ৯টি করে মোট ১৮টি ‘বুথ’ দিয়ে টোল আদায় করা হচ্ছে। এর মধ্যে ঘরমুখো বাইকারদের সুবিধার্থে দুই প্রান্তেই দুটি করে আলাদা বুথে শুধু মোটরসাইকেলের টোল আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।"
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।