উপকূলীয় পটুয়াখালীর কৃষিপ্রধান জনপদ কলাপাড়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তরমুজ চাষে এক অভাবনীয় রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিশ্রমের মেলবন্ধনে এ বছর উপজেলাজুড়ে তরমুজের যে ব্যাপক আবাদ হয়েছে, তা কৃষি খাতে নতুন এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে এই বিশাল সম্ভাবনার মাঝেও ‘মিষ্টি পানির’ তীব্র সংকট কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কলাপাড়ায় তরমুজ চাষের প্রারম্ভিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রবল আগ্রহে সেই ‘ডেডলাইন’ ও লক্ষ্যমাত্রা বহু আগেই অতিক্রম করেছে। বর্তমানে ৪ হাজার ৩৬৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় একটি বড় রেকর্ড। কৃষি কর্মকর্তাদের আশা, সব ঠিক থাকলে এই মৌসুম শেষে অন্তত ২০০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
সরাসরি এই চাষাবাদের সাথে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার প্রান্তিক কৃষক। অনুকূল আবহাওয়া এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় তারা আধুনিক পদ্ধতিতে ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করে মাঠ সাজিয়েছেন। তবে সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। তরমুজগুলো বড় ও সুস্বাদু করার জন্য এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত সেচ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু উপকূলীয় এই অঞ্চলে মিষ্টি পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মোটরের মাধ্যমে পানি এনে সেচ দিচ্ছেন, যা উৎপাদন খরচ বা ‘বাজেট’ অনেকটা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কৃষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এলাকার খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই সংকট প্রকট হয়েছে। লতাচাপলী ইউনিয়নের অভিজ্ঞ কৃষক মো. বেলাল তার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "গত ১০ বছর ধরে আমি তরমুজ চাষ করছি। এ বছর তিন একর জমিতে প্রায় চার লাখ টাকা ইনভেস্ট করেছি। কিন্তু প্রতি বছরই বীজ ও সারের মতো কৃষি উপকরণ কিনতে গিয়ে আমাদের প্রতারণা ও উচ্চমূল্যের শিকার হতে হয়। বাজারের এই অস্থিরতা নিরসনে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।"
অন্যদিকে, প্রযুক্তির ছোঁয়া পেতে মরিয়া নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষক মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি জানান, তারা এখনও পুরোপুরি আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। তবে কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি এবং বিনামূল্যে সার-বীজ বিতরণ তাদের অনেকটা সাহস যোগাচ্ছে। এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার দাবি জানান তিনি।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন এই বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, "সঠিক পরিচর্যা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর আমরা বাম্পার ফলন পাব। তবে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার জন্য খাল পুনঃখনন ও মিষ্টি পানি সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যদি পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায়, তবে ভবিষ্যতে এই উপকূলীয় অঞ্চল দেশের তরমুজের প্রধান হাবে পরিণত হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।"
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।