দিন-রাত চলছে ‘ভেকু’, ট্রাক্টরের দাপটে অতিষ্ঠ জনজীবন: ঈশ্বরদীতে আবাদি জমির বুক চিরে চলছে মাটির কারবার

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় প্রশাসনের কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা ‘টপ সয়েল’ কেটে নেওয়ার এক ভয়াবহ উৎসব শুরু হয়েছে। দিন-রাত সমানতালে কয়েক ডজন এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে আবাদি জমির বুক চিরে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে। এর ফলে একদিকে যেমন এই অঞ্চলের কৃষি জমিগুলো স্থায়ীভাবে উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে মাটিবাহী ভারী ট্রাক্টরের অবাধ চলাচলে সৃষ্ট ধুলোবালি ও তীব্র শব্দদূষণে জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।


সরেজমিনে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। উপজেলার অরনকোলার বাগবাড়িয়া মাঠপাড়া এবং মুলাডুলির পতিরাজপুর এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই চলছে মাটি কাটার কর্মযজ্ঞ। অনেক ক্ষেত্রে পুকুর খননের অজুহাত দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তিন থেকে চার ফুট গভীর করে সরিষার ক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসলি জমি থেকে মাটি সাবাড় করা হচ্ছে। মাটির স্তূপ বিশাল বিশাল ট্রাকে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ইটভাটাগুলোতে। এই পরিবহন প্রক্রিয়ায় এলাকায় কুয়াশার মতো ধুলার আস্তরণ তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ পথচারী ও এলাকাবাসীর জন্য শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।


মাটি কাটার স্থানে নিয়োজিত এস্কেভেটর চালক দেলোয়ার হোসেন জানান, অরনকোলা গরুহাট এলাকার মাটি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম তাদের ভাড়া করে এনেছেন। চুক্তি অনুযায়ী তারা দিন-রাত শিফটে কাজ করছেন এবং সংগৃহীত মাটিগুলো ট্রাক্টরের মাধ্যমে নিকটস্থ ইটভাটাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।


মাটি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলামের দাবি, সলিমপুর ইউনিয়নের মিরকামারি এলাকার বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম তাঁর জমিতে পুকুর খনন করার জন্য তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই বিশেষ চুক্তিতেই তিনি মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছেন। তবে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার কোনো বৈধ অনুমতি তাঁর কাছে আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো লিখিত পারমিশন বা অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে ‘সব কিছু ম্যানেজ’ করেই এই কারবার চালানো হচ্ছে বলে তিনি দম্ভোক্তি প্রকাশ করেন। জমির মালিক জহুরুল ইসলাম অনুমতি নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি। এমনকি অভিযুক্ত জমির মালিক জহুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।


এদিকে, মাটি ক্রেতা জনৈক ইটভাটা মালিক জinnah আলী জানান, ইট তৈরির জন্য তাদের প্রচুর মাটির প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ী আশরাফুলের মাধ্যমে তারা এই মাটি কিনছেন। তবে এই মাটির উৎস বৈধ কি না বা এটি কার জমি থেকে আসছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো দায় নেই বলে তিনি দাবি করেন।


ফসলি জমির এমন ক্ষতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিন। তিনি জানান, কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করতে হলে জেলা প্রশাসকের স্পষ্ট অনুমতি প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “জমির উপরিভাগের মাটি বা টপ সয়েলই হলো ফসলের মূল শক্তি। একবার এই স্তর কেটে ফেললে সেই জমির উর্বরতা ফিরে আসতে অন্তত ২০ বছর সময় লাগে। ফসলি জমির মাটি কাটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এর ফলে আবাদি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।” তিনি জমির মালিকদের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।


সার্বিক বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান বলেন, “ফসলি জমি থেকে এভাবে মাটি কেটে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি অবগত হয়েছি। দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।