দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকুরিতে সর্বনিম্ন মোট বেতন ভাতা মিলিয়ে দাঁড়াবে ৩৩ হাজার টাকার কিছু বেশি। অন্যদিকে সার্বক্ষণিক গাড়িসুবিধা ছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মোট বেতন গিয়ে ঠেকবে প্রায় আড়াই লাখ টাকায়। তবে নতুন এই বেতনকাঠামোর শতভাগ আর্থিক সুবিধা পেতে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অপেক্ষা করতে হবে আরও প্রায় দেড় বছর। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করা হবে এবং বাড়িভাড়াসহ যাবতীয় নতুন ভাতার সুবিধা উপভোগ করতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার বহুল আলোচিত ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল শনিবার সর্বসাধারণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জন্য প্রকাশিত হয়। প্রজ্ঞাপনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন এই বেতনকাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর এই রূপরেখা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।
ঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করা হবে অনলাইনে। এজন্য সরকারের অর্থ বিভাগের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইনফরমেশন সিস্টেম বা ‘আইবাস প্লাস প্লাস’-এর ‘পে ফিক্সেশন’ অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও চাকরির যাবতীয় তথ্য এন্ট্রি দিতে হবে। অনলাইনে বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), চাকরির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বর আবশ্যক হবে। তবে কোনো কর্মচারীর যদি এনআইডি না থাকে, সে ক্ষেত্রে সার্ভিস বুকে থাকা জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য জরুরি ভিত্তিতে হালনাগাদ করে আবেদন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের তুলনামূলক চিত্র
নতুন বেতনকাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রয়েছে। সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে একলাফে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই গ্রেডের একজন কর্মচারী মূল বেতনের সর্বনিম্ন ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন। এর সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত হবে চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা এবং মুঠোফোন ভাতা ১৫০ টাকা। ফলে মফস্বল পর্যায়ে একজন কর্মচারীর সর্বনিম্ন মোট বেতন গিয়ে দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকায়। তবে কর্মস্থল রাজধানী ঢাকা হলে বাড়িভাড়া ৬০ শতাংশ হারে পাওয়ায় এই ২০তম গ্রেডেই মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ঘোষিত মজুরিকাঠামো অনুযায়ী দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
অন্যদিকে বিশেষ গ্রেডে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেতন পাবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। তাঁদের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ঢাকায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হবে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা, ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ২ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা, ৫০০ টাকা মুঠোফোন ভাতা এবং ৩০০ টাকা ধোলাই ভাতা। সব মিলিয়ে তাঁদের মাসিক মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী সার্বক্ষণিক গাড়ি ও জ্বালানিসহ আরও বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা তাঁরা ভোগ করবেন।
এছাড়া সিনিয়র সচিবদের জন্য মূল বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বেতনকাঠামোর এক নম্বর গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে; এই গ্রেডে একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ভাতাসহ সব মিলিয়ে সোয়া দুই লাখ টাকার মতো বেতন পাবেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকুরিতে নবীন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়া তরুণদের ৯ম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা, যা ভাতাসহ সর্বনিম্ন মোট ৬০ হাজার টাকার কিছু বেশিতে গিয়ে পৌঁছাবে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
যদিও এই বেতনকাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে, তবুও প্রথম দিন থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতনের শতভাগ একসঙ্গে পাচ্ছেন না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি আমলে নিয়ে ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরের মধ্যে মোট তিন ধাপে মূল বেতন সমন্বয় করা হবে।
এর মধ্যে প্রথম ধাপে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ মূল বেতনের সঙ্গে যোগ করে পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ সুবিধা পাবেন। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। সবশেষে তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন বৃদ্ধির শতভাগ সুবিধা সব স্তরে কার্যকর করা হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ ছাড় করার জন্য জাতীয় বাজেটে ইতোমধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বর মাসের নিয়মিত বেতনের সঙ্গেই ১ জুলাই থেকে হিসাব করে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করার। তবে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে তা পিছিয়ে গেছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আগামী অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই বকেয়া অর্থ এককালীন প্রদান করা হবে।
পদোন্নতিহীনদের উচ্চতর গ্রেড ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
চাকরির ধারাবাহিকতায় পদোন্নতি না পেলেও আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করতে নতুন আদেশে স্বস্তির বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও একই পদে টানা আট বছর চাকরি পূর্ণ করলে নবম বছরে পদোন্নতি না পেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার অধিকারী হবেন। এরপরও যদি পদোন্নতির জট না খোলে, তবে বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রমের পর চাকরিজীবনে আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ বহাল থাকবে। তবে একই পদের বিপরীতে একাধিক উচ্চতর গ্রেড গ্রহণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যেসব বিশেষ পদে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই এবং যেগুলো সরকারিভাবে ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে চিহ্নিত, সেসব পদের কর্মচারীরাও এই উচ্চতর গ্রেড সুবিধার আওতায় আসবেন।
এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধির নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই। সেই অনুযায়ী একটি ইনক্রিমেন্ট গত ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে কোনো কর্মচারীর চাকরিতে যোগদানের বয়স যদি ছয় মাস পূর্ণ না হয়, তবে তিনি বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের দাবিদার হবেন না।
পেনশনে বড় ধরনের উল্লম্ফন
অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সুরক্ষায় পেনশন সুবিধায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। মোট পাঁচটি পৃথক স্তরে পেনশন বৃদ্ধির রূপরেখা সাজানো হয়েছে, যেখানে নিম্ন আয়ের অবসরপ্রাপ্তদের সুরক্ষায় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি রাখা হয়েছে।
মাসে নিট ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শতভাগ (১০০%) পেনশন বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগে যিনি নিট ৯ হাজার টাকা পেতেন, তিনি এখন থেকে পাবেন ১৮ হাজার টাকা। এছাড়া ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। তবে উচ্চপর্যায়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ বর্তমানে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন ভোগ করা অবসরপ্রাপ্তরা সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত পেনশন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বাড়িভাড়ার নতুন হার ও ভাতার জন্য আরও ১৫ মাসের অপেক্ষা
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন বাড়িভাড়ার শতকরা হার এলাকা ও গ্রেডভেদে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলেও তা কার্যকর হতে অপেক্ষা করতে হবে আরও দীর্ঘ ১৫ মাস। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই নতুন হার কার্যকর হবে; ততদিন পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীরা বিদ্যমান প্রচলিত নিয়মে বাড়িভাড়া পাবেন।
নতুন কাঠামোয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন। এছাড়া ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয়েছে।
ঢাকার বাইরে অবস্থিত দেশের অন্য ১১টি সিটি করপোরেশন, সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকায় বাড়িভাড়ার হার হবে ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৪০ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৩০ শতাংশ। এর বাইরে দেশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা এলাকায় বাড়িভাড়ার হার ধার্য করা হয়েছে ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ, ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৩০ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ২৫ শতাংশ।
এর বিপরীতে বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ (ন্যূনতম ৫ হাজার ৬০০ টাকা), ৯ হাজার ৭০১ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ (ন্যূনতম ৬ হাজার ৪০০ টাকা), ১৬ হাজার ১ থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ (ন্যূনতম ৯ হাজার ৬০০ টাকা) এবং ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার ওপরে ৫০ শতাংশ (ন্যূনতম ১৯ হাজার ৫০০ টাকা) বাড়িভাড়া দেওয়া হয়।
বাড়িভাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য নতুন ভাতার সিংহভাগই কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীরা প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছর ১ দিন বয়স থেকে অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) শেষ হওয়া পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জন্য ৫০ বছর পর্যন্ত চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৬০ বছর ১ দিন থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকলে একজন সরকারি চাকরিজীবী সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য সন্তানপ্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে বিশেষ ভাতা পাবেন। তবে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ ভাতার হার মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে এবার ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত উভয়ের জন্যই বছরে দুটি মূল উৎসব ভাতা অপরিবর্তিত থাকছে। ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানদের লেখাপড়ার সহায়তায় সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ দুই সন্তান পর্যন্ত) শিক্ষাসহায়ক ভাতা দেওয়া হবে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পাবেন মাসে ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা।
যোগাযোগ ব্যবস্থার খরচ মেটাতে সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পাবেন। প্রশাসনিক যোগাযোগের সুবিধার্থে পঞ্চম গ্রেড ও তার ওপরের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে তার নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মাসে ১৫০ টাকা হারে মোবাইল ভাতা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক আপ্যায়ন ভাতা বাবদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মাসে ২ হাজার টাকা, সিনিয়র সচিব ও সচিব ১ হাজার টাকা, অতিরিক্ত সচিব ৯০০ টাকা এবং যুগ্ম সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তারা ৬০০ টাকা পাবেন।
পার্বত্য তিন জেলায় কর্মরতদের জন্য মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে পাহাড়ি ভাতা বহাল থাকছে; তবে জেলা সদর ও সদর উপজেলায় এর সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার এবং অন্যান্য দুর্গম উপজেলায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে হাওর, দ্বীপ ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে কর্মরতদের জন্য ২০ শতাংশ বিশেষ ভাতা দেওয়া হলেও তা কোনোভাবেই ৫ হাজার টাকার বেশি হবে না। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ের সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে থাকা ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদান করা হবে। এছাড়া বিশেষায়িত হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগসহ যেসব সংস্থায় শারীরিক ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য আগের মতোই বিশেষ ও ঝুঁকি ভাতা অব্যাহত থাকবে।
অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের গভীর উদ্বেগ
কাগজে-কলমে সুবিশাল এই বেতনকাঠামো প্রকাশ পেলেও তা বাস্তবায়নের বিপুল আর্থিক সংস্থান কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি এবং চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো সরকারের জন্য এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে তাঁর স্পষ্ট আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, "নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অর্থায়ন কীভাবে হবে, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি। দেড়-দুই বছরে কি রাজস্ব আয় এত বাড়বে? ধরে নিলাম বাড়লই। এ টাকা তো সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতেই ব্যয় হয়ে যাবে। অন্য কাজেও যে অর্থ ব্যয় করতে হবে, তার কী হবে?"
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করে প্রখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ আরও সতর্ক করেন, "একটা উপায় হতে পারে ঋণ নেওয়া। আরেকটা উপায় হতে পারে ব্যয় সাশ্রয় করা। এখানে বাজেট–ঘাটতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে টাকা ছাপাতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। দেখতে হবে যে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার কোন পথ বেছে নেয়।" ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে সরকারের এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করার কৌশল দেখার অপেক্ষায় রয়েছে গোটা দেশ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।