ক্যানভাস থেকে অন্দরমহল: উদ্যোক্তা শাওন খানের স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

শৈশবে রং-তুলি আর ক্যানভাসে ছবি আঁকার যে শখ ছিল, তাকেই আজ পেশাদারিত্বের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন ‘থার্ড ভিশন লিমিটেড’-এর কর্ণধার শাওন খান। ঢাকার যান্ত্রিকতায় বেড়ে ওঠা এই সৃজনশীল মানুষটি ছাত্রজীবনে চারুকলায় ভর্তির সুযোগ না পেয়ে একসময় চরম হতাশায় ভুগলেও দমে যাননি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জিং ক্যারিয়ারে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মতো ভিভিআইপিদের ইভেন্ট সফলভাবে পরিচালনা করে তিনি রপ্ত করেছিলেন নিখুঁত কাজের মন্ত্র। তবে ক্ষণস্থায়ী ইভেন্টের চাকচিক্য ছাপিয়ে মানুষের স্বপ্নের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দেওয়ার অদম্য বাসনা থেকেই তিনি পা রাখেন ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশনের জগতে। আজ নিজের মেধা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে শাওন খান শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, বরং সহস্রাধিক মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে তার সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় তিলে তিলে সাজিয়ে তুলছেন অন্যের স্বপ্নের আলয়। আজ আমরা তাঁর মুখেই শুনবো তাঁর সেই অদম্য পথচলা আর সফলতার পেছনের গল্প।


প্রশ্ন ১: শুরুতেই আপনার নিজের সম্পর্কে একটু বলুন। নিজেকে কোন পরিচয়ে সবার সামনে তুলে ধরতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

শাওন খান: আমি পেশায় একজন উদ্যোক্তা এবং বর্তমানে ‘থার্ড ভিশন লিমিটেড’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ইন্টেরিয়র ডিজাইন এবং কনস্ট্রাকশন সেক্টরে নতুন কিছু করার লক্ষ্য নিয়েই আমাদের কাজ। তবে আমি নিজেকে ‘থার্ড ভিশন লিমিটেড’-এর একজন কর্ণধার হিসেবে পরিচয় দিতেই সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করি, কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি আমার অনেক স্বপ্ন এবং কঠোর পরিশ্রমের ফসল।


প্রশ্ন ২: আপনার ছোটবেলার কোনো বিশেষ স্মৃতি কি আজকের এই মানুষটি হয়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছে?

শাওন খান: আমি ছোটবেলা থেকেই খুব সৃজনশীল ছিলাম। ক্লাস সিক্স-এ থাকতে একবার একটা সিঙ্গেল কালার দিয়ে ছবি আঁকছিলাম, বাবা দেখে খুব উৎসাহ দিলেন। এরপর মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুরো এক সেট ওয়াটার কালার কিনি। সেই থেকে রঙের দুনিয়ায় ডুবে যাওয়া। যদিও চারুকলায় পড়ার সুযোগ না পেয়ে আমি ভেঙে পড়েছিলাম, কিন্তু আজ বুঝি-সেই ছোটবেলার ‘কীভাবে কাজ করে’ খোঁজার টেকনিক্যাল কৌতূহল আর ‘রং-তুলির প্রতি ভালোবাসা’-এই দুটোর সমন্বয়েই আজ আমি মানুষের ঘর বা অফিসকে মনের মতো করে সাজাতে পারছি।

প্রশ্ন ৩: উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার যাত্রার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? ব্যবসার এই আইডিয়াটা প্রথম মাথায় কীভাবে এলো?


শাওন খান: আমার পেশাদার জীবন শুরু হয় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে কাজ করে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মতো ভিভিআইপি প্রটোকলের ইভেন্ট পরিচালনা করার সুযোগ হয়েছে। সেখানে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি কীভাবে ১০০% নিখুঁত এবং সময়ানুবর্তী হতে হয়। কিন্তু একটা সময় মনে হলো, ইভেন্টের ব্যাপ্তি তো ক্ষণস্থায়ী। আমি এমন কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলাম যা স্থায়ী হবে। তখন মনে হলো, মানুষের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের যে বিশাল দায়িত্ব, তা যদি আমি আমার সৃজনশীলতা দিয়ে করতে পারি! এভাবেই জন্ম নিল 'থার্ড ভিশন লিমিটেড'।


প্রশ্ন ৪: নতুন ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা কেমন ছিল?

শাওন খান: আমার বাবা গার্মেন্টস মেশিনারিজের ব্যবসা করতেন। তাকে দেখেই ব্যবসার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। যখন আমি প্রতিষ্ঠিত চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত এক ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম, পরিবার আমাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। পরিবারের সেই নিঃশর্ত সাপোর্ট আর বিশ্বাস না থাকলে আমি হয়তো এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস পেতাম না।


প্রশ্ন ৫: ব্যবসার শুরুতে আপনার চ্যালেঞ্জগুলো কেমন ছিল?

শাওন খান: যেকোনো নতুন ব্যবসায় প্রতিকূলতা থাকেই। আমরা শুরু থেকেই প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে ‘আউট অব দ্য বক্স’ কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। ক্লায়েন্ট যা প্রত্যাশা করতেন, আমরা সবসময় তার চেয়ে বেশি কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ডিজাইন, টেকসই ম্যাটেরিয়াল এবং সাশ্রয়ী মূল্যএই তিনের সমন্বয় করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা আমাদের আজ একটি আলাদা পরিচয় দিয়েছে।


প্রশ্ন ৬: বর্তমানে আপনাদের ব্যবসার পরিধি কতটুকু? প্রতিষ্ঠানটি কতটা বড় হয়েছে?

শাওন খান: আমরা এখন কনস্ট্রাকশন খাতে ডুপ্লেক্স ও ট্রিপ্লেক্স ভিলা, গলফ ক্লাব, মসজিদ, কমার্শিয়াল বিল্ডিং এবং ল্যান্ডস্কেপিং নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি ইন্টেরিয়র সেক্টরে কর্পোরেট অফিস, ব্যাংক ও শোরুম ডিজাইন করছি। শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আমাদের প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজেক্ট ‘আপন ঠিকানা’ নিয়ে আমরা খুব আশাবাদী, যেখানে সাধারণ মানুষ সাধ্যের মধ্যে অল্প জায়গায় নিজের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করতে পারবেন।


প্রশ্ন ৭: আপনার কাছে ‘সাফল্য’-এর সংজ্ঞা আসলে কী?

শাওন খান: একজন ক্লায়েন্ট যখন তার দীর্ঘদিনের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ নিতে দেখেন এবং তার চোখে-মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে-আমার কাছে সেটাই হলো প্রকৃত সফলতা। ক্লায়েন্টের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে পারাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সার্থকতা।


প্রশ্ন ৮: যারা নতুন উদ্যোক্তা হতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

শাওন খান: যারা শূন্য থেকে শুরু করতে চান, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো-কাজে সবসময় সততা বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি কাজকে নিজের ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ কাজ মনে করে ডেলিভারি দিতে হবে। শর্টকাট খুঁজে রাতারাতি সফল হওয়ার চেষ্টা করা ঠিক নয়। ধৈর্য, ডিসিপ্লিন এবং ধারাবাহিকতা-এই তিনটি জিনিস থাকলে সাফল্য আসবেই।

শাওন খানের এই গল্প আমাদের শেখায় যে, কোনো ব্যর্থতাই চূড়ান্ত নয়। চারুকলায় সুযোগ না পাওয়া সেই কিশোরটি আজ তার সৃজনশীলতা দিয়ে হাজারো মানুষের ঘর রাঙাচ্ছেন। তার ‘থার্ড ভিশন লিমিটেড’ আজ কেবল একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মানুষের আস্থা ও স্বপ্নের এক অনন্য নাম। দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করার যে স্বপ্ন শাওন খান দেখছেন, তা আগামী দিনের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।


"আমি আমার ক্যারিয়ারটাকেই পেইন্টিংয়ে রূপান্তর করে ফেলেছি। ক্যানভাসের বদলে এখন মানুষের ঘর, অফিস আর স্বপ্নগুলোকে মনের মতো করে সাজাই।"শাওন খান