বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের ডোমেইন নাম, আইপি অ্যাড্রেস (IP Address) এবং কারিগরি মান ব্যবস্থাপনার প্রধান তদারককারী সংস্থা ‘ইন্টারনেট করপোরেশন ফর অ্যাসাইনড নেম অ্যান্ড নম্বর’ বা আইক্যান (ICANN)-এর ৮৫তম বৈশ্বিক সম্মেলন ভারতের মুম্বাইয়ে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে। শনিবার মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারে ছয় দিনব্যাপী এই ‘আইক্যান-৮৫ কমিউনিটি ফোরাম’ এর পর্দা ওঠে। সম্মেলনের প্রথম দিনেই ইন্টারনেটের বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে একাধিক অধিবেশন বা সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘হাউ ইট ওয়ার্কস-আইক্যান পলিসি’ শীর্ষক একটি বিশেষ অধিবেশন। সেখানে বক্তারা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন যে, আধুনিক বিশ্বের চালিকাশক্তি ‘ইন্টারনেট’ প্রকৃতপক্ষে কোনো একক ব্যক্তি, বিশেষ প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নেই। বরং এটি একটি ‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার’ মডেল অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এই মডেলে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধিদের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে বৈশ্বিক নীতিমালা নির্ধারিত হয়।
নীতিমালা প্রণয়নের এই জটিল প্রক্রিয়াকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, আইক্যানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত মূলত ‘বটম-আপ’ (Bottom-up) পদ্ধতিতে তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেটের সমস্যা বা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিতকরণ, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন, প্রস্তাবিত খসড়া নীতিমালার ওপর বিশ্বব্যাপী জনমত যাচাই এবং সর্বশেষ আইক্যান বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই .com, .net কিংবা .org-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ডোমেইন নামগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়। বিশেষ করে আসন্ন নতুন ‘জেনেরিক টপ লেভেল ডোমেইন’ চালু করা এবং ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ বা ‘ডিএনএস অ্যাবিউজ’ (DNS Abuse) রুখতে এবারের আলোচনার গুরুত্ব অপরিসীম।
আইক্যান-৮৫ সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে শতাধিক দেশের সহস্রাধিক প্রতিনিধি অংশ নিলেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেছে। এই দলে রয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর ডোমেইন বিভাগের ম্যানেজার জয়িতা সেন রিম্পি এবং হোস্টিং ডটকমের বাংলাদেশ অপারেশন ম্যানেজার ইমরান হোসেন।
সম্মেলনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিটিআরসি-র মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ দেশ মিডিয়াকে জানান, "ইন্টারনেট এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আইক্যানের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকার ফলে আমরা ডোমেইন নেম সিস্টেমের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছি। এটি দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।"
অন্যদিকে, হোস্টিং ডটকমের বাংলাদেশ অপারেশন ম্যানেজার ইমরান হোসেন বলেন, "এটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম। বৈশ্বিক এই ফোরামে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের হয়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।" আগামী কয়েক দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI)-এর প্রভাব, ইন্টারনেট নিরাপত্তা এবং ডোমেইন সিস্টেমের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।