বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দুই বছর আগে সংঘটিত একটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের জট অবশেষে খুলেছে। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার ভয়ে নিজের জন্মদাতা পিতাকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে বড় ছেলের বিরুদ্ধে। শুধু হত্যাই নয়, লাশটি যাতে কোনোভাবেই শনাক্ত করা না যায়, সেজন্য গভীর জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধারের পর দীর্ঘ সময় পরিচয় না মেলায় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করেছিল। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; পিবিআই-এর নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক পাষণ্ড পুত্রের পৈশাচিকতার পূর্ণ চিত্র।
গ্রেপ্তারকৃত আসামির নাম বেলাল হোসেন, যিনি পেশায় একজন সিএনজি ও মাইক্রোবাস চালক। গত শনিবার চট্টগ্রামের মইজ্জারটেক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সময় মিরসরাই থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর সহযোগী ও ভায়রা আবদুল জলিলকে। গত রবিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেলাল তাঁর বাবাকে খুনের প্রতিটি ধাপের বর্ণনা দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহত মীর মুজিবুর রহমান (৬০) বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চাম্বল এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন। মুজিবুর রহমান চারটি বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। স্ত্রীর ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ মেটাতে তিনি তাঁর মালিকানাধীন প্রায় ৪০ শতক জমি বিক্রি করে দেন এবং বাঁশখালীর পৈতৃক ভিটেমাটিও বিক্রির চেষ্টা করছিলেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম স্ত্রীর দুই সন্তান বেলাল ও আনোয়ার। মূলত পৈতৃক সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাই এই হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ বা কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
বাবার গতিবিধি নজরদারি করতে বেলাল এক অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নেন। তিনি এক দালালের ছদ্মবেশে ফোন করে নিশ্চিত হন যে তাঁর বাবা শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে চাইছেন। এরপর বাবাকে ফাঁদে ফেলতে তিনি নিজের এক নারী বন্ধুকে দায়িত্ব দেন। ওই নারী ফোনে কথা বলে প্রেমের অভিনয় করে মুজিবুরকে বশ করেন এবং ২০২৪ সালের ৭ জুন তাঁকে দেখা করার প্রলোভন দেখিয়ে চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার একটি বাসায় ডেকে আনেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই বাসায় আগে থেকেই ঘুমের ওষুধ মেশানো শরবত রাখা ছিল। মুজিবুর সেই শরবত পান করে অচেতন হয়ে পড়লে ঘাতক বেলাল এবং তাঁর ভায়রা জলিল একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে তাঁকে সিআরবি হয়ে আউটার রিংরোড এলাকায় নিয়ে যান। চলন্ত গাড়িতেই গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নিজ পিতাকে হত্যা করেন বেলাল। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হালিশহর রিংরোড এলাকার নির্জন জঙ্গলে মরদেহটি ফেলে তাঁরা পালিয়ে যান।
মরদেহ উদ্ধারের সময় নিহতের পকেটে বা শরীরে কোনো পরিচয়পত্র না থাকায় পুলিশ সেটিকে বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করে। এদিকে বাবার নিখোঁজ সংবাদ পেয়ে তাঁর বোন সালমা বেগম ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আদালতে মামলা করলে পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। ডিজিটাল ডেটা ও কললিস্ট বিশ্লেষণ করে শেষ পর্যন্ত ঘাতক পুত্রের সন্ধান পায় পিবিআই।
নিহত মুজিবুরের মেয়ে সালমা বেগম অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, “একজন মানুষ তাঁর নিজের জন্মদাতাকে জমিজমার জন্য কীভাবে মারতে পারে? আমি আমার ভাইয়ের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই, যাতে আর কোনো সন্তান তাঁর পিতার সাথে এমন আচরণ করার সাহস না পায়।” বর্তমানে মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সেই নারী সহযোগীকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।