ক্ষমতার অংশীদারিত্ব না কি কেবল পরামর্শ? যমুনায় শরিকদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর রুদ্ধশ্বাস বৈঠক

যুগপত আন্দোলনের শরিকদের সাথে সরকারের দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘোচাতে এবং মিত্র জোটকে আরও সুসংহত করতে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এই বৈঠকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ উঠে এসেছে, ঠিক তেমনি ছিল না পাওয়া এবং অপূর্ণতার তীব্র আক্ষেপ। সরকার গঠনের দীর্ঘ পাঁচ মাস পর অনুষ্ঠিত এই ‘হাই-ভোল্টেজ’ বৈঠকে শরিকদের অনেকেই সরাসরি ‘ক্যাবিনেট’ বা মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ চেয়েছেন বিশেষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মিত্র দলগুলোর নেতাদের মূল ক্ষোভ ছিল সরকার গঠনের পর গত পাঁচ মাস শরিকদের সাথে কোনো প্রকার নীতিনির্ধারণী যোগাযোগ না রাখা নিয়ে। ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ দেশ মিডিয়াকে জানিয়েছেন, তাঁদের বক্তব্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল—একসাথে রাজপথে আন্দোলন করে সরকার গঠনের পর কেন শরিকরা ব্রাত্য হয়ে রইল? এমনকি সরকার গঠনের ৫ মাসে কোনো সৌজন্য বিনিময়ও হয়নি। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে তাঁদের বক্তব্য শোনেন এবং এই বিলম্বের পেছনে সংগত কিছু বাস্তব কারণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, নতুন সরকার গঠনের পর নানা প্রশাসনিক ঝামেলা সামলানো, পবিত্র রমজান মাস, সংসদের বিশেষ অধিবেশন এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অনেকটা সময় ব্যয় করতে হয়েছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এখন থেকে শরিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও সঠিক সমন্বয় বজায় রাখা হবে।

বৈঠকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ মোট পাঁচজন নেতা বক্তব্য রাখেন। আলোচনায় উঠে আসে যে, নির্বাচনের আগে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমানে মাত্র তিনটি শরিক দলের নেতাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি শরিকদের জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দিলেও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী হওয়া নেতাদের মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরের পাশাপাশি ববি হাজ্জাজকে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আন্দালিভ রহমান পার্থকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শরিকদের দাবি, সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে মিত্র দলগুলোর নেত্রীদের বিবেচনা করা হলে জোটের ঐক্য আরও দৃশ্যমান হতো। এমনকি বিএনপির ৩১ দফা ও ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করে সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ গঠিত হলে সেখানেও তাঁদের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি জানানো হয়।

জোটের শরিকরা আরও অভিযোগ করেন যে, মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা কমে যাওয়া এবং স্থানীয় সরকারের প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করায় তৃণমূল পর্যায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ‘স্মার্টফোন’ ও সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের যে সমালোচনা চলছে, সেটিও প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি অবহিত করেন নেতারা। এছাড়া সম্প্রতি রাশেদ খাঁনকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, শরিকদের মধ্যে যারা যোগ্য ও ত্যাগী, তাঁদের পর্যায়ক্রমে যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তিনি আন্দোলনের মূল ভিত্তি ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তাঁর সরকারের অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে সরকারের ভেতরে ও বাইরে থাকা রাজনৈতিক মিত্রদের মাঝে দীর্ঘদিনের জমে থাকা মেঘ কাটার নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।