পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে এখন সম্মুখ সমরের আমেজ। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যকার বাগযুদ্ধ এক চরম ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত মঙ্গলবার ‘শহীদ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি সব হিসাব বুঝে নেবেন। এর ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই গতকাল বুধবার রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তার অত্যন্ত কড়া এবং আক্রমণাত্মক জবাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বুক থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘নাম-নিশান’ চিরতরে মুছে ফেলা এখন তাঁর প্রধান রাজনৈতিক দায়িত্ব। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০৩১ সালের হিসাব নেওয়ার পরিকল্পনাকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “২০৩১ সালে আপনি জেলের বাইরে থাকলে তবেই তো হিসাব নেওয়ার সুযোগ পাবেন।” শুভেন্দুর এমন মন্তব্য মূলত তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আসন্ন আইনি পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে এ রাজ্যের রাজনীতিতে আমূল মেরুকরণ ঘটেছে। নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পায়। তবে নির্বাচনের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলটিতে বড় ধরনের ধস নামতে শুরু করেছে। দলীয় সূত্রে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৭০ জনই বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, দলের ২৮ জন লোকসভা সদস্যের (এমপি) মধ্যে ২০ জনই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে নবগঠিত দল ‘এনসিপিআই’-তে শামিল হয়েছেন। এই বিশাল দলছুট ও ভাঙনের ফলে তৃণমূল এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও গত মঙ্গলবার কলকাতার বিড়লা তারামণ্ডলের কাছে এক সভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক ‘মেইন্টেন্যান্স’ বা মেরুদণ্ড বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, গাদ্দারি করে তৃণমূলকে দুর্বল করা যাবে না এবং বিজেপির মিথ্যা মামলার কাছে তিনি মাথা নত করবেন না। তিনি দাবি করেন, “আজ নতুন করে তৃণমূলের জন্ম হলো, যা আগামী ৪০ বছর লড়াই চালিয়ে যাবে।”
তবে মুখ্যমন্ত্রীর পরবর্তী পরিকল্পনা তৃণমূলের জন্য আরও বড় কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, আগামী ২৫ জুলাই আমপান ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে হওয়া ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব নিরীক্ষক (সিএজি)-এর ২৮টি রিপোর্ট বিধানসভায় উপস্থাপন করা হবে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজ্যপালের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ না করে সরাসরি তাঁকে ‘প্রতিষ্ঠিত চোর’ হিসেবে প্রমাণ করার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। পশ্চিমবঙ্গের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন কোন দিকে মোড় নেয় এবং আইনি মারপ্যাঁচে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কী হয়, সেটিই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।