মোদির ‘অপরাজেয়’ ইমেজে বড় ফাটল: জেন-জি প্রজন্মের ডিজিটাল বিদ্রোহে কেন কাঁপছে দিল্লি?

ভারতের সমকালীন রাজনীতিতে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং নজিরবিহীন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর এই চ্যালেঞ্জ কোনো প্রথাগত বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নয়, বরং এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক এক অদম্য তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে, যাদেরকে বিশ্বজুড়ে ‘জেন-জি’ (Gen-Z) হিসেবে অভিহিত করা হয়। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে যে ৩৬ দিনের ঐতিহাসিক আন্দোলনের যবনিকা ঘটল, তা মূলত মোদি সরকারের তথাকথিত ‘অপরাজেয়’ ইমেজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত শনিবার শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগ কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়, বরং এটি ভারতের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের এক বিশাল নৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP) নামক একটি নামমাত্র অনলাইন সংগঠন কীভাবে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি অনুসারী সংগ্রহ করে রাজপথের দখল নিল, তা এখন সমাজতত্ত্ববিদদের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রায় পুলিশের লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাসের মুখেও তরুণদের অটল অবস্থান প্রমাণ করেছে যে, ভয়ের ‘ভাইরাস’ আর তাঁদের দমাতে পারছে না। এই তরুণরা র‍্যাপ সংগীত, সৃজনশীল প্ল্যাকার্ড আর ‘স্মার্টফোন’ ব্যবহার করে খোদ মোদির দিকে যে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিয়েছেন, তা ২০১৪-পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতিতে ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

লন্ডনের এসওএসএস (SOAS) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় শ্রীবাস্তবের মতে, এটি একটি বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। ক্ষমতাসীন দলই দেশের জন্য একমাত্র ভালো বিকল্প—বিশাল এক জনগোষ্ঠীর এই অন্ধ শ্রদ্ধাবোধে এখন বড় ধরণের চিড় ধরেছে। আন্দোলনের নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁস নয় বরং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আইটি (IT) খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI)-এর প্রভাবে চাকরি হারানোর ভয় তরুণদের মধ্যে এক ধরণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি করেছে। বর্তমান ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশেরই বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হলেও লোকসভায় তাঁদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১০ শতাংশ, আর কেন্দ্রীয় ‘ক্যাবিনেট’ বা মন্ত্রিসভার গড় বয়স ৬০ বছরেরও বেশি। নীতিনির্ধারকদের এই বার্ধক্য আরুণদের স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার এক বড় ধরণের ‘গ্যাপ’ তৈরি করেছে।

ডিজিটাল যুদ্ধের ময়দানও এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন স্থানান্তরিত হয়েছে ‘ইনস্টাগ্রাম’-এ। যেখানে বিজেপির কয়েক বছরের পরিশ্রমে অনুসারী সংখ্যা ১ কোটি, সেখানে সিজেপি মাত্র কয়েক দিনেই তার দ্বিগুণ অনুসারী পেয়েছে। লেখকদের মতে, ইনস্টাগ্রামের জন্য যে ধরণের স্বচ্ছতা আর স্বকীয়তা প্রয়োজন, মোদি সরকারের সাজানো-গোছানো ‘প্যাকেজ’ প্রচারণা সেখানে খাপ খাচ্ছে না। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের অভাবনীয় জয় মোদি সরকারকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে যে, তরুণ ভোটাররা এখন কেবল ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে নারাজ।

২০২১ সালে কৃষি আইন বাতিলের জন্য কৃষকদের প্রায় এক বছর লড়াই করতে হয়েছিল, অথচ এই জেন-জি প্রজন্ম মাত্র ৩৬ দিনেই সরকারকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করেছে। উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও গুজরাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনের আগে এই ঘটনা বিজেপির জন্য একটি বড় ধাক্কা। যদিও সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন যে তাঁরা এখনই সক্রিয় রাজনীতিতে আসছেন না, তবুও ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে মোদি সরকারের সামনে এটি এক বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এখন থেকে যে নেতা জনগণের কথা শুনবেন, তিনিই কেবল রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবেন—ভারতের বর্তমান এই পরিস্থিতি সেই বার্তাই দিচ্ছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।