ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান নজিরবিহীন অস্থিরতা এবং রাজধানী দিল্লির উত্তাল রাজপথের লড়াই আজ এক নাটকীয় পরিণতির সাক্ষী হলো। দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রবল ছাত্রবিক্ষোভ এবং ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) অনড় অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। আজ শনিবার দুপুরের দিকে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংকটের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা দেশবাসীকে জানিয়েছেন।
পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধান তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রথম দিন থেকেই আমি এই উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় গ্রহণ করেছি এবং নৈতিক জায়গা থেকে কখনো মুখ ঘুরিয়ে নিইনি।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যন্তর মন্তর এবং সারা দেশে চলমান এই অস্থিরতাকে যেন কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে ব্যবহার করতে না পারে এবং জাতীয় ঐক্য যেন অটুট থাকে, সেই লক্ষ্যেই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও যোগ করেন, কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন দীর্ঘমেয়াদী আইনি জটিলতায় আটকে না যায় এবং দেশের সন্তানেরা যেন তাঁদের মূল্যবান সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে পারে—সেটিই বর্তমানে তাঁর সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
উল্লেখ্য, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির এই ‘ভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়ার প্রতিবাদে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির যন্তর মন্তর ময়দানকে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছিল সিজেপি-র সদস্যরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছিল দেশের আপামর জনতা ও বিরোধী দলগুলো। গতকাল শুক্রবার কনস্টিটিউশন ক্লাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক রুদ্ধশ্বাস বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে সিজেপি-র পক্ষ থেকে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবির একটি ‘প্যাকেজ’ তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের প্রতিহিংসামূলক আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং প্রশ্ন ফাঁসের গ্লানিতে আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ১ কোটি রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।
বৈঠকে সরকার পক্ষ প্রথম দুটি দাবিতে নীতিগতভাবে সম্মতি দিলেও ধর্মেন্দ্র প্রধানের কুর্সি রক্ষায় অনড় ছিল। এমনকি বিজেপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র গণমাধ্যমকে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনা নেই। এরপরই সিজেপি-র পক্ষ থেকে পদত্যাগের জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার একটি চূড়ান্ত ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। আজ বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে তৃতীয় দফার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই নাটকীয়ভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এক বিশাল নৈতিক বিজয় উপহার দিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এই পদত্যাগ মোদি সরকারের ভাবমূর্তিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।