অপ্রতিম হত্যা: আইফোনই কি দায়ী?

কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বড় অংশজুড়ে এসেছে তাঁর পরিবার, চলাফেরা ও হাতে থাকা আইফোন। কিন্তু শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে এ ধরনের ঘটনায় দায় কি শুধু মা-বাবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়, নাকি শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন?

অপ্রতিম কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত শুক্রবার দুপুরে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেনি সে। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে পরিকল্পিতভাবে ওই নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়েছিল। বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে অভিযুক্তরা চলে যায়। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি তুহিনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট তদন্তের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

আতঙ্কে অভিভাবকেরা

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে কেউ শিশুদের স্মার্টওয়াচে জিপিএস ট্র্যাকার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ স্কুলব্যাগ, পোশাক বা জুতায় আলাদা ট্র্যাকার লাগানোর কথা বলছেন।

সিলেটের জগন্নাথপুরের বাসিন্দা ইকবাল আহমেদও এমন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর সাড়ে চার বছর বয়সী একমাত্র সন্তান রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে একের পর এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর উদ্বেগ এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

ইকবালের ভাষায়, ‘আমি চাই নিরাপত্তা থাকুক। সরকার যেন সেটা নিশ্চিত করে। মা-বাবা খেয়াল রাখবে, মা-বাবা দায়িত্ব নেবে, এটা বললে তো হবে না।’

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমের মা–বাবাকে নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। কেউ বলছেন, তাঁর বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে পরিবারের আরও খোঁজ রাখা উচিত ছিল। আবার কেউ অপ্রতিমের বয়সে বড়দের সঙ্গে মেলামেশা, মোটরসাইকেল চালানো, টিকটকে ভিডিও প্রকাশ কিংবা ‘কিশোর গ্যাং’-এর সঙ্গে চলাফেরার অভিযোগ সামনে আনছেন।

এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ। তবে একটি শিশুর মৃত্যুর পর ঘটনার দায় সরাসরি তার মা-বাবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আগে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, অভিযুক্তদের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

নিখোঁজের পরও মিলছে না অনেক শিশুর সন্ধান

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে।

পুলিশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নিখোঁজের সব ঘটনা অপহরণ বা হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বিশেষ করে ছোট শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে পথ হারাতে পারে, নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় বাড়ি ফিরতে নাও পারে। তবে নিখোঁজ থাকা শিশুদের একটি অংশের বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য না থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ফলে অপ্রতিমের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের সন্ধান না পাওয়া কিংবা পরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলোও একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

পরিবার কতটা, রাষ্ট্র কতটা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ফাতেমা রেজিনা ইকবাল মনে করেন, শিশুদের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, শিশুরা প্রতিবেশী, পরিচিত কিংবা অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের শিকার হতে পারে। তাই শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ছোট ও একক পরিবারে সারাক্ষণ শিশুর ওপর নজর রাখা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখাও বাস্তবসম্মত নয়। তাই কোন পরিস্থিতি বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা শিশুদের বোঝানোর পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগের মতে, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধ, প্রতিশোধ বা ক্ষোভ থেকেও শিশু হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো একটি পক্ষের ওপর এককভাবে দায় চাপালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তিনি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কিশোররা অপরাধে জড়িত থাকলে তাদের ওপর সমবয়সীদের চাপ বা প্রভাব ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি আইফোন, একটি পরিবার কিংবা কয়েকজন অভিযুক্তের গল্প নয়। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারের সচেতনতা, সামাজিক পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা সবগুলো বিষয়ই একসঙ্গে আলোচনায় আসছে। আর অপ্রতিম হত্যার প্রকৃত দায় ও ঘটনার পূর্ণ চিত্র নির্ধারিত হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।