নদীর দেশ বাংলাদেশে বর্ষা মানেই এক ভিন্ন জীবনধারা। তবে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার মোবারকদী গ্রামের মানুষের কাছে আষাঢ়-শ্রাবণের এই সময়টি কেবল ঋতু পরিবর্তন নয়, বরং তাঁদের সারা বছরের ‘ইকোনমিক প্যাকেজ’ বা অর্থনৈতিক সংস্থানের একমাত্র মাধ্যম। বছরের দীর্ঘ সময় আলস্য বা দিনমজুরিতে কাটলেও, মেঘের ঘনঘটা আর বৃষ্টি নামার সাথে সাথেই এই গ্রামে শুরু হয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। গ্রামের অলিগলি এখন হাতুড়ি আর বাটালের ‘ঠক ঠক’ শব্দে মুখর। এখানকার শতাধিক পরিবারের কয়েক শ মানুষ এখন দিনরাত ব্যস্ত ডিঙি নৌকা তৈরিতে, কারণ এই তিন মাসের উপার্জনেই নির্ধারিত হয় তাঁদের পুরো বছরের পারিবারিক ‘বাজেট’।
উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মোবারকদী গ্রামটি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘নৌকা গ্রাম’ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো এই পৈতৃক পেশাকে আঁকড়ে ধরে টিকে আছে অন্তত ১০০টি পরিবার। ৪৫ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর সরকার এই পেশার এক অভিজ্ঞ মুখ। তিনি জানালেন, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই কাজই তাঁদের জীবন। জাহাঙ্গীর সরকারসহ আরও অনেকের হাতে তৈরি এই নিখুঁত ডিঙি নৌকাগুলো কেবল চাঁদপুরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরসহ উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে এখানে ভিড় জমান। এই বিশেষ নৌকার চাহিদাই তাঁদের বছরের মূল ‘টার্গেট’ বা লক্ষ্যমাত্রা।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে মোবারকদী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুপাশে ৮ থেকে ১০টি ছোট-বড় কারখানা বা শেডে চলছে নৌকা বানানোর ধুম। কারিগরেরা মেহগনি, চাম্বুল ও কড়ইগাছ সংগ্রহ করে সেগুলো রোদে শুকিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে ডিঙি নৌকার অবয়ব দিচ্ছেন। আব্দুল মান্নান প্রধান নামের একজন উদ্যোক্তা জানান, একটি মাঝারি আকারের নৌকা তৈরিতে তাঁদের চার থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। বাজারে এই নৌকাগুলো বিক্রি হয় আট থেকে ১০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ সব খরচ মিটিয়ে প্রতিটি নৌকায় তাঁদের গড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা লাভ থাকে। বর্ষার এই ভরা মৌসুমে একেকজন মালিক এক থেকে দেড় শতাধিক নৌকা বিক্রি করেন। কাঠ আর উপকরণের দাম বাড়লেও পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্যকে তাঁরা কোনোভাবেই ‘ডেডলাইন’ বা শেষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান না।
স্থানীয় কারিগর চান্দু মিয়া ও খোরশেদ আলীর মতো দক্ষ শ্রমিকেরা প্রতিটি নৌকা তৈরি করে এক হাজার টাকারও বেশি পারিশ্রমিক পান। বর্ষা শেষে যখন পানিবন্দী মানুষের যাতায়াত ও মাছ ধরার জন্য নৌকার বিকল্প থাকে না, তখনই চাঙ্গা হয়ে ওঠে এই কুটির শিল্প। গ্রামটিতে বর্তমানে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পেশার সাথে যুক্ত থেকে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
এ বিষয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম এক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “একটি নির্দিষ্ট গ্রামে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ নৌকা তৈরির সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি সত্যিই অভাবনীয়। প্রশাসনিক প্রটোকল অনুযায়ী আমরা এই গ্রামটি পরিদর্শন করে তাঁদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করব এবং এই ক্ষুদ্র শিল্পকে আরও টেকসই করতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা প্রদানের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।” নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরায়ত এই শিল্প আজ মোবারকদী গ্রামের মানুষের হাতের ছোঁয়ায় এক নতুন বাণিজ্যিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।