‘২৮০০ টাকার নামজারি করতে হয়েছে ২২ হাজারে’

বরিশাল সদর ভূমি অফিসে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা না দিলে সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রার্থীরা। তাদের দাবি, ঘুসের বিনিময়ে দ্রুত কাজ হলেও নিয়ম অনুযায়ী সেবা নিতে গেলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে জানা যায়, নগরীর পোর্ট রোড এলাকার সদর ভূমি অফিসে ঘুস বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে অফিসের প্রধান সহকারী দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটে অফিস সহকারী আতিকুর রহমান খান, কম্পিউটার অপারেটর কুতুব উদ্দিন, সার্ভেয়ার জালাল উদ্দিন, সার্ভেয়ার রিয়াজসহ কয়েকজন রয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জমির মিউটেশনে ১১৭৫ টাকা এবং অনলাইন চার্জ ৪শ টাকা দেওয়ার কথা। তবে সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, বাস্তবে প্রতিটি মিউটেশনের জন্য আট থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ১৪৩ ও ১৫০ ধারার মামলাগুলোও চুক্তির ভিত্তিতে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রধান সহকারী দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে।

বরিশাল সদরের চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের মজিবর হাওলাদার বলেন, একটি ১৫০ ধারার কেস শেষ করার জন্য দীর্ঘদিন ভূমি অফিসে ঘুরেও কাজ করাতে পারেননি তিনি। পরে ওই অফিসের এক দালালের মাধ্যমে প্রধান সহকারী দেলোয়ারের সঙ্গে ৭০ হাজার টাকার চুক্তি করেন। এরপর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তার কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দেলোয়ার হোসেন। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা একাধিক ব্যক্তিও সরকারি নিয়মের বাইরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, নির্ধারিত নিয়মে কাজ করাতে গেলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। বিপরীতে অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সেবাপ্রার্থীদের আরও অভিযোগ, ১৫০ ধারার ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী সরেজমিনে সার্ভেয়ারের যাওয়ার কথা থাকলেও অর্থের বিনিময়ে অফিসে বসেই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সহকারী ভূমি কমিশনারের আস্থাভাজন হিসেবে দেলোয়ার হোসেন ভূমি অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন। শুধু সদর ভূমি অফিস নয়, বরিশাল সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

কাশিপুর ইউনিয়নের মান্নান খলিফা বলেন, দুটি জমির নামজারি করতে গেলে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন তার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে অনুরোধের পর ২২ হাজার টাকায় তিনি রাজি হন। মান্নান খলিফার দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দুটি জমির নামজারিতে ২ হাজার ৮শ টাকা লাগার কথা থাকলেও তাকে অতিরিক্ত ১৯ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামের মোক্তার হোসেন বলেন, একটি জমির পরচা আনতেও সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। তার অভিযোগ, নামজারির ক্ষেত্রেও বাড়তি টাকা ছাড়া কাজ করা সম্ভব হয় না।

তবে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, সেখানে নিয়ম মেনেই কাজ করা হয় এবং ঘুসের অভিযোগ সঠিক নয়।

এদিকে চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় জেলহাজতে গেলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই বরখাস্তের আদেশ উপেক্ষা করেই তিনি ভূমি অফিসে ঘুস বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোর মধ্যে আমানতগঞ্জ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হা. ম আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালে ঘুস বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে তাকে বদলি করে আমানতগঞ্জ ভূমি অফিসে আনা হলেও সেখানেও একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল সদর ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘পুরোপুরি স্বচ্ছতা আছে, সেটা বলব না। তবে আগে যে পরিমাণ দালাল ছিল সেটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। তবে শতভাগ দালাল মুক্ত হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কারও বিরুদ্ধে ঘুসের লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ভূমি সেবায় সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ নেওয়ার এসব অভিযোগ নিয়ে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি, ভূমি অফিসে দালাল ও অনিয়ম বন্ধ করে নির্ধারিত ফিতে দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।