হাটে যাওয়ার ঝামেলা শেষ: জয়পুরহাটের এক নিভৃত গ্রামেই জমে উঠেছে করলার মেগা পাইকারি বাজার!

গ্রামের শান্ত পরিবেশ, মসজিদের ঠিক সামনের খোলা জায়গায় ত্রিপল টাঙিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি অস্থায়ী শেড। আর তার নিচেই সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে তরতাজা সবুজ করলাভর্তি প্লাস্টিকের ক্রেট ও বস্তা। দুপুর গড়াতেই জমিতে সদ্য তোলা করলা কাঁধে বা ভ্যানে চাপিয়ে সরাসরি সেই শেডে জড়ো হতে শুরু করেন স্থানীয় কৃষকেরা। কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানি ছাড়াই সরাসরি পাইকারি ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন নিজেদের রক্তজল করা ফসলের ঝুড়ি।

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার প্রত্যন্ত বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামের এই দৃশ্য এখন প্রতিদিনের। এটি কোনো সরকার অনুমোদিত কিংবা ইজারাভুক্ত প্রথাগত হাট নয়; অথচ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এই গ্রামীণ চত্বরে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ মণ করলার রমরমা পাইকারি বেচাকেনা চলে। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই প্রায় দেড় দশক ধরে, অর্থাৎ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে গ্রামের ভেতরের এই নিভৃত স্থানটিই রূপ নিয়েছে করলার অন্যতম প্রধান পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্রে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞ। শেডের নিচে বসে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করলা বাছাই করে প্লাস্টিকের ক্রেট ও ব্যাগে ভরছেন শ্রমিকেরা। বাছাইকৃত সেই সবজি দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের উদ্দেশ্যে পাশে প্রস্তুত রাখা হয়েছে একের পর এক পিকআপ ভ্যান। ঠিক তখনই দেখা যায়, আগের দিন সন্ধ্যায় বিক্রি করা ফসলের ন্যায্য বকেয়া টাকা পাইকারি ব্যবসায়ীর হাত থেকে হাসিমুখে বুঝে নিচ্ছেন দুই প্রান্তিক কৃষক।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে এই বিশেষ বাজারে বগুড়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাঁচ-ছয়জন বড় পাইকারি ক্রেতা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে করলা কিনছেন। প্রতিদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই দরদাম ও কেনাবেচার ধুম। এরপর রাতভর প্যাকেজিং শেষে পরদিন ভোর হতেই পিকআপে বোঝাই করে এসব করলা পৌঁছে যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বড় বড় কাঁচাবাজারে।

স্থানীয় কৃষকদের জন্য এই বাজার এক বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তাঁরা জানান, তাঁদের গ্রাম থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী নিয়মিত হাট হলো ‘চৌমুহনী হাট’, যার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। তবে সেই হাটটি সপ্তাহে কেবল দুই দিন—শনিবার ও মঙ্গলবার বসে। এছাড়া ক্ষেতলাল পৌরসভার ‘ইটাখোলা হাট’-এর দূরত্ব এই গ্রাম থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার। ফলে দূরবর্তী হাটে সবজি পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ ও সময়ের অপচয় এড়াতে গ্রামের এই উন্মুক্ত বাজার কৃষকদের জীবনে আমূল স্বস্তি এনে দিয়েছে। জমি থেকে ফসল তুলেই কোনো পরিবহন খরচ ছাড়া সরাসরি বিক্রি করতে পারায় তাদের লাভের অঙ্কও বাড়ছে।

গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি এদিন এক মণ করলা ২ হাজার ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। কোনো ধরনের সাপ্তাহিক হাটের জন্য তাঁকে করলা মজুত রেখে নষ্ট করতে হয়নি, আবার হাটে যাওয়ার ভাড়াও গুণতে হয়নি। বগুড়া শহর থেকে আসা নিয়মিত পাইকারি ক্রেতা বাবু মণ্ডল জানান, বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামের এই অস্থায়ী বাজারে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ মণ করলা বেচাকেনা হয়ে থাকে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সতেজ পণ্য পাওয়ায় তিনিও নিয়মিত এখান থেকেই করলা কিনে বিভিন্ন আড়তে সরবরাহ করেন।

বাজারটির উৎপত্তির স্মৃতিচারণ করে স্থানীয় বাসিন্দা মুরশিদুল ইসলাম জানান, আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের ফসলের মাঠে করলার ব্যাপক ফলন হওয়ায় প্রায় ১৫ বছর আগে কয়েকজন পাইকার এখানে এসে সরাসরি করলা কেনা শুরু করেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় কৃষক ও উৎপাদনের পরিমাণ বহুগুণ বাড়ায় ধীরে ধীরে জায়গাটি এক স্থায়ী পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে রূপ লাভ করে।

কৃষি বিভাগের ইতিবাচক মূল্যায়নেও উঠে এসেছে এই বাজারের ভূমিকা। ক্ষেতলাল উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মাসউদ পারভেজ জানান, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় মোট ৬০ হেক্টর জমিতে করলার বাম্পার আবাদ হয়েছে। বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামে প্রতিদিনের এই পাইকারি বাজার বসার কারণে কৃষকেরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য ছাড়াই নিজেদের উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে পারছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।