পরিত্যক্ত নোনা জমিতেই ফলল ‘সোনা’; থাই ও আমেরিকান আম বেচেই মিনারুলের আয় ৮ লাখ!

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার খিতাপচর গ্রামের কৃষক মিনারুল হকের বাগানে এখন আর আগের মতো কোলাহল নেই। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে থাই চিয়াংমাই, ব্রুনেই কিং কিংবা আমেরিকান রেড পালমার আম দেখতে ভিড় করতেন ক্রেতারা, সেই গাছগুলো এখন প্রায় ফলশূন্য। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা আমের এই উৎসবে মিনারুলের বাগান থেকে একে একে বিদায় নিয়েছে বিরল সব জাতের আম। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি গাছে ‘বারি-৪’ আম ঝুললেও সেগুলোও মূলত সিজন বা মৌসুমের শেষ অতিথি। তবে বিদায় বেলায় মিনারুলের মুখে হাসি ফুটিয়েছে তাঁর পরিশ্রমের ফসল। চলতি মৌসুমে শুধুমাত্র আম বিক্রি করেই তাঁর পকেটে এসেছে ৮ লাখ টাকারও বেশি।

মিনারুল হকের এই বাগানটি সাধারণ কোনো বাগান নয়। এখানে আছে ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্যময় জাতের আমের সমারোহ। দেশি আম্রপালি ও বারি-৪ এর পাশাপাশি তাঁর ‘মেসার্স হক এগ্রো ফার্ম’-এ শোভা পেয়েছে থাইল্যান্ডের বারোমাসি কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, চিয়াংমাই এবং কিং অব চাকাপাত। এছাড়া ব্রুনেইয়ের বিশাল আকৃতির ‘ব্রুনেই কিং’, যুক্তরাষ্ট্রের নজরকাড়া ‘রেড পালমার’ এবং চীনের রাজকীয় ‘রেড আইভরি’ জাতের আমগুলো স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। কোনোটি দেখতে কলার মতো লম্বা, কোনোটির খোসা পাকার পর টকটকে লাল হয়ে ওঠে, আবার কোনোটি চিনির মতো মিষ্টি। প্রায় ১০ হাজার কেজি আম বিক্রি করার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে মিনারুল হক ও তাঁর পরিবারকে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে।

এই সাফল্যের শুরুটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। আজ থেকে ছয় বছর আগেও এই ১০ একর জমির বিশাল অংশ ছিল পরিত্যক্ত ও লোনা পানিতে ডোবা। জোয়ারের সময় লোনা জল ঢুকে পড়ায় কেউ সেখানে চাষাবাদের কথা চিন্তাও করেনি। অন্যদিকে মিনারুলের দুই ছেলে তানভীরুল হক ও সাইদুল হক উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যখন চাকরির বাজারে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখনই তাঁরা এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। চাকরির পেছনে না ছুটে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা ‘বাজেট’ নিয়ে ৭০টি বরই চারা রোপণের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁদের এই কৃষি বিপ্লব। আজ সেই ছোট উদ্যোগটিই একটি সফল ‘ইন্টিগ্রেটেড’ বা সমন্বিত খামারে রূপান্তরিত হয়েছে।

বর্তমানে এই খামারে শুধু আম নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি ‘প্যাকেজ’ বিদ্যমান। খামারে থাকা গরু, ছাগল ও হাঁসের বর্জ্য থেকে তৈরি হয় প্রাকৃতিক জৈব সার, যা সরাসরি ব্যবহার করা হয় আম, বরই, পেয়ারা, মাল্টা ও কলার বাগানে। এই রাসায়নিকমুক্ত চাষ পদ্ধতির কারণেই ক্রেতারা সরাসরি বাগানে এসে ফল কিনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে এই খামার থেকে আম ছাড়াও পেয়ারা ২ লাখ, বরই ৫ লাখ, সুপারি ৪ লাখ এবং ডাব ও কলা থেকে প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আয় হয়েছে। অর্থাৎ বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে এই খামার থেকে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-এর ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান জানান, মিনারুল হকের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ব্যানানা ম্যাঙ্গো ও কাটিমন জাতের আমগুলো বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ভালো সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে বড় পরিসরে চাষের আগে মাটি ও রোগবালাই নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বোয়ালখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহানুর ইসলামের মতে, এই পরিবারের মাসিক আয় এখন ১ লাখ টাকার উপরে, যা স্থানীয় যুবসমাজের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। মিনারুল হক প্রমাণ করেছেন, ‘স্মার্টফোন’ আর প্রযুক্তির এই যুগে সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে পরিত্যক্ত জমিও সোনার খনিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।