উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ‘জনতার বাজার-১’-এ তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাজারটির উদ্যোক্তাদের দাবি, গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আদালতের আদেশের তোয়াক্কা না করেই বাজারের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং কর্মরত কর্মচারীদের বের করে দেওয়া হয়।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্যোক্তারা এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তারা অবিলম্বে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থিতাবস্থা বজায় রেখে বাজারটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জোর দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উদ্যোক্তা বোরহান উদ্দিন। এসময় তার সঙ্গে সানোয়ারুল হকসহ অন্যান্য উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন। উদ্যোক্তারা জানান, ২০২৫ সাল থেকে তারা মোহাম্মদপুরে এই বাজারটি পরিচালনা করে আসছিলেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্যে পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই ‘জনতার বাজার’-এর মূল লক্ষ্য।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, শুরুর দিকে নীতিমালা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব ছিল পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করা এবং জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা কেনাবেচা ও দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করতেন। তবে পরবর্তীতে হঠাৎ নীতিমালা পরিবর্তন করে প্রশাসনের কর্মচারীদের বেতনসহ অতিরিক্ত আর্থিক দায়ভার উদ্যোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ ওই কর্মচারীদের নিয়োগ বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে জেলা প্রশাসনের হাতেই রয়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ১০ দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গত ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজারের দখল ও বর্তমান অবস্থান অপরিবর্তিত রাখা। এছাড়া আদালতের অবমাননা করে যারা বাজারে তালা দিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন, বাজারের নীতিমালা পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি যাচাই এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক ক্ষতির দায় নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। এছাড়া জবাইখানা নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত টিআর অর্থের ব্যবহার ও সরকারি ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিটের দাবিও করেন তারা।
উদ্যোক্তা সানোয়ারুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে তাদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। চুক্তি অনুযায়ী পণ্য বিক্রির ওপর মাত্র ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ কাটার কথা ছিল। অথচ প্রশাসন থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে উদ্যোক্তারা সেই অর্থ জমা দেননি। সানোয়ারুল হকের পাল্টা দাবি, এই অর্থ কাটার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের নিয়োজিত সুপারভাইজারদের, উদ্যোক্তাদের নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ বদলি হওয়ার পর থেকেই বাজার পরিচালনায় অসহযোগিতা শুরু হয়। বিশেষ করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মাহাবুব উল্লাহ মজুমদারের বিরুদ্ধে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন তিনি। এমনকি বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সফটওয়্যার কেনা এবং কর্মচারীদের উপস্থিতির সরঞ্জামও উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থায়নে করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চুক্তি বাতিলের চিঠির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে উদ্যোক্তারা বলেন, গত ১২ জুলাই তাদের হাতে একটি চিঠি পৌঁছায় যাতে তারিখ লেখা ছিল ৩০ জুলাই এবং সেখানে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত নির্দেশ ছিল। যা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অসঙ্গতিকে স্পষ্ট করে।
তবে উদ্যোক্তাদের এসব অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মাহাবুব উল্লাহ মজুমদার। মুঠোফোনে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, “ঢাকা জেলা প্রশাসন উচ্চ আদালতের আদেশের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। উদ্যোক্তারা যেসব অভিযোগ করছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।”
উদ্যোক্তারা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের স্বার্থে এই বাজারটি সচল রাখতে দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ চেয়েছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।