‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে?’: আট বছর পর সেই বীভৎস আর্তনাদের বিচার শুরু

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বিভীষিকাময় ও হৃদবিদারক অধ্যায় হয়ে আছে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ড। ২০১৮ সালের ২৬ মে গভীর রাতে কথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে যখন একরামকে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন তাঁর শিশুকন্যার অবুঝ প্রশ্ন—‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে?’ থমকে দিয়েছিল পুরো দেশবাসীকে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ‘অডিও’ ক্লিপটি শুনেছিলেন কোটি মানুষ, যেখানে বিদ্ধ হয়েছিল এক পিতার শেষ আর্তনাদ আর ঘাতকের বুলেটের শব্দ। তবে সেই পৈশাচিক ঘটনার পর দীর্ঘ আট বছর অতিক্রান্ত হলেও স্বজনহারা এই পরিবারটি কেবল বিচার নয়, বরং মন খুলে কাঁদার অধিকারটুকুও পায়নি। অবশেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই রুদ্ধশ্বাস অন্ধকারের পর্দা সরতে শুরু করেছে এবং খুলেছে বিচারের রুদ্ধ দুয়ার।

তদন্তে ও ভুক্তভোগী পরিবারের বয়ানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের চিত্র। টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের টানা তিনবারের জনপ্রিয় কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যার আগে এক কুৎসিত রূপকথা সাজানো হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির মাদক সিন্ডিকেটকে প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক চাপ থেকে আড়াল করতেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একরামকে ‘বলি’ দেওয়া হয়। অতি সাধারণ একটি টিনের ঘরে বসবাস করা একরামের গায়ে জোরপূর্বক ‘ইয়াবার গডফাদার’ তকমা সেঁটে দিয়ে তৎকালীন র‍্যাব-৭-এর একটি বিশেষ দল এই হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে। মূল ঘাতকদের বাঁচাতে গণমাধ্যমের সামনে একরামকে আগেভাগেই অপরাধী বানানোর এক নোংরা চক্রান্ত লিপ্ত ছিল তৎকালীন প্রশাসনের প্রভাবশালী কিছু মহল।

হত্যাকাণ্ডের পর একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম ও তাঁর দুই মেয়ে তাহিয়া ও নাহিয়ানকে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও নজরদারির মুখে পড়তে হয়। তাঁদের নিজ বাড়ি থেকে এক প্রকার উচ্ছেদ করে চট্টগ্রামের একটি গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হয়। সেখানেও নিস্তার মেলেনি ভয়ংকর হয়রানি থেকে। আয়েশা বেগম জানান, তাঁদের ঘরের বাইরে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ বাহিনীর লোক ছায়ার মতো লেগে থাকত। সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে মহড়া দিত অচেনা মুখগুলো। তাঁদের সরাসরি হুমকি দেওয়া হতো—‘বেশি নাড়াচাড়া করলে আপনাদেরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’ এমনকি টেকনাফ থানায় পুলিশ কোনো মামলা নেয়নি এবং আদালতে আইনজীবীরাও ভয়ের ‘ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে এই কেস লড়তে অস্বীকার করেছিলেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অমানবিক অভিযোগটি উঠেছে তৎকালীন নীতিনির্ধারণী মহলের বিরুদ্ধে। আয়েশা বেগমের দাবি অনুযায়ী, তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাঁকে ফোন করে সংবাদমাধ্যম বা মানবাধিকার সংস্থার সামনে মুখ না খুলতে এবং কান্নাকাটি না করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে তাঁদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঠিকই, তবে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রমাণিত হয়েছে যে সেটি ছিল কেবল প্রতিবাদের মুখ বন্ধ রাখার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল।

অবশেষে আট বছর পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিনের জমানো চোখের জল আর পাহাড়সম তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন আয়েশা বেগম। সেই রাতের কল রেকর্ড এবং উচ্ছেদের দলিলাদি এখন আদালতের প্রধান নথিপত্র। এই হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল। আয়েশা বেগমের বিশ্বাস, এবার হয়তো সেই অনাচারী শক্তির বিচার হবে এবং তাঁর স্বামীর আত্মাও শান্তি পাবে। দেশবাসী এখন তাকিয়ে আছে সেই ঐতিহাসিক বিচারের দিকে, যেখানে প্রমাণিত হবে যে কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।