অ্যানেস্থেশিয়ার রহস্য, মস্তিষ্কে আসলে কী ঘটে?

অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে অচেতন রাখতে সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহু বছর ধরে এর সফল ব্যবহার হলেও অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ ঠিক কীভাবে মানুষের চেতনাকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়, সেই প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

অ্যানেস্থেশিয়ার প্রভাবে একজন মানুষ সাময়িকভাবে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা হারান। অস্ত্রোপচারের সময় সাধারণত ব্যথার অনুভূতিও থাকে না এবং পরে ওই সময়ের স্মৃতি অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। ওষুধের প্রভাব কমে গেলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক চেতনা ফিরে আসে।

তবে এই প্রক্রিয়াকে শুধু ‘ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির জটিলতা বোঝা যায় না। গবেষকদের মূল প্রশ্ন হলো অ্যানেস্থেশিয়ার সময় মস্তিষ্কের কোন পরিবর্তনের কারণে সচেতন অভিজ্ঞতা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

মস্তিষ্কে আসলে কী ঘটে?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগের ধরন পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষ করে থ্যালামাস ও মস্তিষ্কের কর্টেক্সের মধ্যকার যোগাযোগে পরিবর্তন দেখা যায়।

থ্যালামাসকে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অ্যানেস্থেশিয়ার সময় এই যোগাযোগের ধরন ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ আগের মতো সমন্বিতভাবে তথ্য গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না।

এখানেই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ রাসায়নিকভাবে একে অপরের থেকে বেশ আলাদা। কিন্তু ভিন্ন রাসায়নিক গঠনের এসব ওষুধ একই ধরনের ফলাফল অর্থাৎ চেতনা হারানোর অবস্থা তৈরি করতে পারে। ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়া দিয়ে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

অ্যানেস্থেশিয়া সাধারণ ঘুমের মতো নয়

অ্যানেস্থেশিয়াকে স্বাভাবিক ঘুমের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্দিষ্ট ধাপে ও ছন্দে পরিবর্তিত হয় এবং উপযুক্ত উদ্দীপনায় মানুষকে জাগানো সম্ভব। অন্যদিকে, অ্যানেস্থেশিয়ার সময় সচেতন তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক যোগাযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

অ্যানেস্থেশিয়ার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসে। ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম বা EEG পরীক্ষার মাধ্যমে এসব পরিবর্তনের কিছু অংশ পর্যবেক্ষণ করা যায়। চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে এ ধরনের তথ্য ব্যবহার করে অ্যানেস্থেশিয়ার গভীরতা সম্পর্কে ধারণা পান।

তবে EEG-তে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের পরিবর্তন দেখা গেলেও সেটিই চেতনা হারানোর পুরো ব্যাখ্যা নয়। চেতনা কীভাবে তৈরি হয়, মস্তিষ্কের কোন কোন নেটওয়ার্ক এতে একসঙ্গে কাজ করে এবং অ্যানেস্থেশিয়া কীভাবে সেই সমন্বয় সাময়িকভাবে ব্যাহত করে এসব প্রশ্ন নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

তাহলে রহস্যটা কোথায়?

সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, মানুষের চেতনা আসলে কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে সেটিকে সাময়িকভাবে বন্ধ করা সম্ভব। অ্যানেস্থেশিয়া বিজ্ঞানীদের এমন একটি বিরল সুযোগ দিয়েছে, যেখানে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে চেতনাকে সাময়িকভাবে পরিবর্তন করা যায় এবং পরে তা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

অ্যানেস্থেশিয়া কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীদের একাধিক তত্ত্ব রয়েছে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট রিসেপ্টর ও আয়ন চ্যানেলের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার অন্য গবেষকেরা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ, তথ্যের সমন্বয় এবং নিউরাল নেটওয়ার্কের কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

অর্থাৎ, অ্যানেস্থেশিয়া কীভাবে চেতনাকে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক কিছু জানতে পেরেছেন। কিন্তু ভিন্ন ধরনের ওষুধ কীভাবে একই ধরনের অচেতন অবস্থা তৈরি করে এবং সেই অবস্থায় মস্তিষ্কে চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলো ঠিক কীভাবে পরিবর্তিত হয় তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যানেস্থেশিয়ার ব্যবহার দীর্ঘদিনের এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় নিরাপদে চেতনা সাময়িকভাবে বন্ধ ও ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়ার পেছনে থাকা মস্তিষ্কের রহস্য এখনো বিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয় হয়ে আছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।