জ্বর-কাশিকে সাধারণ ভাবছেন? ২০ বছরের গবেষণায় আঁতকে ওঠার মতো তথ্য

সাধারণ সর্দি-কাশি কিংবা তীব্র শ্বাসকষ্টকে স্রেফ ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই। দীর্ঘ দুই দশকের নিবিড় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বলছে, বাংলাদেশে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা। তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও জ্বর-কাশি নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অন্তত ১৩ শতাংশই এই ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত। একই সঙ্গে দেশের পরিবেশ ও প্রাণিজগতে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০৭ সাল থেকে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) যৌথভাবে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এই দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক উদ্যোগে কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী সহায়তা দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীতে আইইডিসিআরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে বিশ বছরের এই সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ, জেলা হাসপাতাল এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির এই যৌথ নজরদারি ব্যবস্থা শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, বৈশ্বিক রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, ‘টিকা ইনফ্লুয়েঞ্জা মোকাবিলার একটি কার্যকর উপায় হলেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার এবং সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য।’

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক মোনালিসা এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পটভূমি ও অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালেই দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এর আগে ২০১১-১২ সালে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান ১৬ হাজার ৮০৪ জন মানুষ। ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত অসুস্থতা দেশের উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক বোঝা তৈরি করছে। তিনি আরও জানান, বিশ্বের ১৩৮টি দেশে থাকা ১৫৭টি ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টারের মধ্যে আইইডিসিআর অন্যতম একটি স্বীকৃত কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০ বছর ধরে দেশের ১৫টি সরকারি এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জা-সদৃশ অসুস্থতা ও মারাত্মক তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (এসএআরআই) নিয়ে আসা রোগীদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হয়। হাসপাতালগুলোর তালিকায় রয়েছে—ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল; যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল; ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (গাজীপুর), কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ ছাড়া সিলেটের বেসরকারি জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এই নজরদারি পরিচালিত হয়।

এই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে আধুনিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ২২ হাজার ২৮৪ জনের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যা মোট রোগীর প্রায় ১৩ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। তবে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ৬০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী প্রবীণদের ক্ষেত্রে। হাঁচি, কাশি এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমেই সংক্রামক এই শ্বাসনালীর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম নিয়ে সমাজে প্রচলিত দীর্ঘদিনের একটি ভুল ধারণাও ভেঙে দিয়েছেন গবেষকেরা। সাধারণত শীতকালে এই রোগের প্রকোপ বাড়ে বলে ধারণা করা হলেও তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। ২০ বছরের গবেষণা বিশ্লেষণ করে আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টিই মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকৃত মৌসুম। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে দেশে সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন পাঁচ শ্রেণির মানুষ। তারা হলেন—সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগে (কো-মরবিডিটি) আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরা।

সেমিনারের মুক্ত আলোচনা পর্বে টিকার ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত মতামত উঠে আসে। বিশেষজ্ঞরা উচ্চঝুঁকিতে থাকা ওই পাঁচ শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনার সুপারিশ করেন। তবে দেশের সব নাগরিককে প্রতিবছর এই টিকার আওতায় আনা অর্থনৈতিকভাবে বিশাল ব্যয়বহুল হওয়ায় জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) এটি এখনই অন্তর্ভুক্ত করা বাস্তবসম্মত হবে কি না, তা নিয়ে মিশ্র মত দেখা দেয়। বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী পরামর্শ দেন, যেহেতু এপ্রিল থেকে মৌসুম শুরু হয়, তাই এর অন্তত এক মাস আগে অর্থাৎ মার্চ মাসেই ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা গ্রহণ করা সবচেয়ে উপযুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাবিব হাসপাতালে আসা শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্ক ও যৌক্তিক হওয়ার আহ্বান জানান।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি রেসপন্স বিভাগের মহাপরিচালক সৈয়দা জেসমিন সুলতানা, যুক্তরাষ্ট্র সিডিসির ঢাকার কর্মকর্তা মনোয়ার মোর্শেদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার আইরিন ইসিবুর।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।