সিটি নির্বাচন ঘিরে সিলেট বিএনপিতে বাড়ছে বিভেদ

সিলেট নগরকেন্দ্রিক বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও দূরত্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। এক পক্ষের কর্মসূচিতে অন্য পক্ষের অনুপস্থিতি, নেতাদের পরস্পরকে এড়িয়ে চলা এবং বিভিন্ন আয়োজনে অংশ না নেওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। এতে দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও বিভাজনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ অভিযোগ তুলে মহানগর বিএনপির একাধিক নেতা ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। তবে রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে বরণসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির নেতারা অংশ নিয়েছিলেন।

মহানগর বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত আটজন নেতা তৎপর রয়েছেন। স্থানীয় নেতাদের একটি অংশের মতে, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দূরত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে বিএনপির সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিষয়টি দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না; সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজনে কে সম্পৃক্ত ছিলেন বা ছিলেন না, সেটিও কারণ হতে পারে।

সক্রিয় তিনটি পক্ষ

স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিলেটের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অনুসারীরা সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবীরের অনুসারীদের নিয়ে আরেকটি পক্ষও সক্রিয় হয়েছে বলে কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, সিটি নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।

মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ্ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর বিএনপির দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার দাবি, কয়েকজন নেতা বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এবং সাম্প্রতিক সময়ে মিফতাহ্ সিদ্দিকীর সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সুসম্পর্কের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব সম্পর্কের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রতিবেদনে আলাদাভাবে এসেছে।

১ সেপ্টেম্বর মহানগর বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধনের সময়ও পক্ষগুলোর দূরত্বের বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকীকে মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। স্থানীয় নেতাদের একটি অংশ এর পেছনে সিটি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়টি দেখছেন।

এর আগেও নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২০ মে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি তর্কের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ নিয়ে তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেন। একই বছরের ১ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনায় নাছিম হোসেইনের উদ্যোগে এতিম শিশুদের খাবার বিতরণ অনুষ্ঠানেও ঝামেলার অভিযোগ ওঠে।

দ্বন্দ্বের নেপথ্যে সিটি নির্বাচন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। মনোনয়ন না পাওয়ার পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তাঁকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়। এরপর থেকেই মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তাঁর নাম আলোচনায় আসে।

মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতার ভাষ্য, জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিটি প্রশাসক করা হবে এমনটা মহানগরের রাজনীতিতে থাকা অনেক নেতা আগে ভাবেননি। ফলে তাঁর সঙ্গে আগে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা কয়েকজন নেতার দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। নাগরিক সংবর্ধনায় অনুপস্থিতির ঘটনাকেও তাঁরা সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন।

মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, আয়োজকদের ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ কারণে মহানগরের অনেক নেতা নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেননি। তবে রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে বরণসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে তাঁরা উপস্থিত ছিলেন।

রেজাউল হাসান কয়েস লোদীও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতিত নেতাদের বড় একটি অংশ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিবেক বাধা দিয়েছে।

তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী নাগরিক সংবর্ধনাকে দলীয় আয়োজন নয়, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অনুষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, অনুষ্ঠানটি সর্বজনীন করতে বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপির মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান।

সিলেট মহানগর বিএনপিতে এই মতপার্থক্য শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করছে সামনে থাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং দলীয় মনোনয়নপ্রক্রিয়ার ওপর। আপাতত বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাদের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ দূরত্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।