লংমার্চের সময়ে বিদেশে জামায়াতের ৩৪ এমপি, যা বলছে দল

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চ কর্মসূচি চলার মধ্যেই দলটির ৩৪ জন সংসদ সদস্য (এমপি) বিদেশ সফরে রয়েছেন। ১৭ দিনের এই সফরে এমপিদের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। সব মিলিয়ে সফরকারী দলের সদস্যসংখ্যা ৭১ জন।

আট দফা দাবিতে ১১-দলীয় ঐক্যের রংপুরমুখী লংমার্চ ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যেই জামায়াতের এমপিদের বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এই সফর আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। দলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এমপিদের বিদেশে নেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, সফরকারী ৩৪ এমপির মধ্যে ২৫ থেকে ২৬ জন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়েছেন।

সফরকারী দলের সঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং সাবেক এমপি ও সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রয়েছেন। লেখক জিয়াউল হকও সফরসঙ্গী হয়েছেন।

জানা গেছে, ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দফায় সফরকারী দলের সদস্যরা মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁরা সিঙ্গাপুরে যান। সিঙ্গাপুর থেকে শনিবার ফিলিপাইনে পৌঁছেছেন তাঁরা। সফর শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা রয়েছে। পথে বাহরাইনে যাত্রাবিরতি থাকবে। ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ

মালয়েশিয়া সফরের সময় জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এবং রাজনৈতিক দল কেদিলান রাকাইয়াতের আন্তর্জাতিক-বিষয়ক ব্যুরোর প্রধান মাসজলি মালিক সাক্ষাৎ করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজ (আইএআইএস) মালয়েশিয়ার সঙ্গেও যুক্ত।

১৭ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক পোস্টে জামায়াতের এমপিদের আতিথ্য দেওয়ার কথা জানান মাসজলি মালিক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেদিলান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো ও আইএআইএস মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বিশ্বজুড়ে সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন সারদারের ‘পোস্ট-নরমাল টাইমস’ ধারণা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা, সততা, জবাবদিহি এবং জনগণের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জামায়াতের সূত্রের দাবি, মাসজলি মালিক নিজ উদ্যোগে এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সফরকারীরা কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার ও ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন।

সিঙ্গাপুরে সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ

১৭ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে পৌঁছান জামায়াতের এমপিরা। সেখানে তাঁরা নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি সিম্পোজিয়ামেও অংশ নেন তাঁরা।

সিম্পোজিয়ামে সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর শনিবার সফরকারী দল ফিলিপাইনে পৌঁছায়। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

২৪ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইন থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁদের। ওমরাহ পালনের আগে বাহরাইনে যাত্রাবিরতির সময় বিমানবন্দরের আশপাশের কিছু স্থান ঘুরে দেখার পরিকল্পনাও রয়েছে। সৌদিতে ওমরাহ শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা।

‘প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি’ বলছে জামায়াত

সফরকারী দলের সদস্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, জামায়াতের আমিরের অনুমতি নিয়ে এমপিরা বিদেশ সফরে গেছেন। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারকেও অবহিত করা হয়েছে।

সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, জামায়াতের অনেক এমপি আগে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাননি। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান পরিস্থিতি, উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তাদের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যেই এই সফর।

সফরকারী সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, এই সফরের পরিকল্পনা আরও আগে করা হয়েছিল। তবে সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের কারণে তা পিছিয়ে যায়। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের অনেকেই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং তাঁদের অনেকেরই দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করাই সফরের উদ্দেশ্য। তিনি এটিকে একধরনের প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সফরকারী সদস্যদের ভাষ্য, এটি কোনো রাজনৈতিক সফর নয়। তবে মালয়েশিয়ার সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছে। পূর্বপরিচিতি ও সাংগঠনিক যোগাযোগের সূত্র ধরেই এসব সাক্ষাৎ হয়েছে বলে তাঁরা জানান।

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সফরে বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বিরোধী দল, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এমপিরা। এসব আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর চ্যালেঞ্জ, সংসদীয় আচরণ, এমপিদের ভূমিকা, স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহি ও পরিকল্পনার মতো বিষয় উঠে আসছে।

‘পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা’

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, দলটিকে দেশের দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থানে নিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতাদের আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমান বিদেশ সফর সেই পরিকল্পনারই অংশ বলে সূত্রটি জানায়।

সূত্রগুলো আরও বলছে, ভবিষ্যতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দলের সদস্যদের সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সফরে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্ব ও ছাত্রসংগঠনের নেতারাও অংশ নিতে পারেন।

জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে এসব সফরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া সেলের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এর আগেও দলের অনেক সদস্য বিদেশে গেছেন। বর্তমান সফরও তারই ধারাবাহিকতা। তবে এবার বিশেষভাবে সংসদ সদস্যদের জন্য এই সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।