দুই যুগের লড়াই শেষে নতুন অধ্যায়

একটি দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা কেবল নির্বাচনের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সার্থকতা নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালকের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও বর্জনীয় বিষয়গুলোর ওপর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ৫৫ বছরে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমাদের দেশের বিপুল জনসংখ্যা সত্ত্বেও জাতিগতভাবে আমরা অত্যন্ত অভিন্ন; প্রায় শতভাগ মানুষের ভাষা এক, ৯০ শতাংশের ধর্মবিশ্বাস এক এবং সবার খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিতেও রয়েছে গভীর মিল। তা সত্ত্বেও মানুষের মনোজগতে বিভেদের এক বিশাল প্রাচীর খাড়া হয়ে আছে, যার ফলে গণতন্ত্র বারবার দুয়ারে এসেও ফিরে গেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মূলে ছিল অসহিষ্ণুতা, যার চড়া মূল্য জাতি বহুবার দিয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে এক নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে। ‘সকালেই বোঝা যায় সারা দিন কেমন যাবে’—এই প্রবাদটি পুরোপুরি মানতে না চাইলেও বর্তমান প্রশাসনের কিছু কর্মকাণ্ড জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের বিদায় প্রক্রিয়া, বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়া এবং কিছু কিছু মন্ত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায় যে, সরকার এখনো কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হয়তো তাঁর ওপর অর্পিত এই বিশাল গুরুভার সামলাতে গিয়ে করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণে কিছুটা হিমশিম খাচ্ছেন। তবে জাতির বিপুল আস্থার মর্যাদা দিতে তাঁর দ্বিধাবোধের আর কোনো সুযোগ নেই।

তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থেকেও যেভাবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এখন তিনি বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি। কোনো দল ক্ষমতায় এলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হতে সময় লাগে না। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতা-কর্মীদের মনে ত্যাগের উপযুক্ত মূল্য পাওয়ার আকাক্সক্ষা থাকা স্বাভাবিক। তবে প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, শপথ নেওয়ার পর দল নয়, বরং দেশের জনগণই তাঁর কাছে মুখ্য হওয়া উচিত। তাঁকে বিশেষ নজর দিতে হবে আমলাতন্ত্রের ওপর। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, আমলারা অনেক সময় পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারেন না এবং নতুন সরকারকে নিয়মিত রুটিন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে ‘লোহা গরম থাকতে আঘাত করার’ মতো শুরুতেই আমলাতন্ত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিগত আওয়ামী সরকারের শাসন আমল থেকে বড় শিক্ষা হলো চাটুকারিতা ও তোষামোদের সংস্কৃতি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাটুকারিতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর ও তাঁর পরিবারের জন্য করুণ পরিণতি বয়ে এনেছে। চাটুকারদের প্রশ্রয়ে দেশজুড়ে যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্থাপত্য ও মূর্তি তৈরি হয়েছিল, গণরোষের মুখে তা ধুলোয় মিশে গেছে। এটি যেকোনো রাষ্ট্র পরিচালকের জন্য এক বিশাল শিক্ষা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নামের আগে-পরে বিশেষণ যোগ করতে নিষেধ করে একটি প্রশংসনীয় সূচনা করেছেন। আলংকারিক বিশেষণের কোনো মূল্য নেই যদি তা জনমনে ভালোবাসা তৈরি করতে না পারে।

প্রায় সাড়ে নয় শ বছর আগে পারস্যের প্রখ্যাত প্রধানমন্ত্রী ‘নিজাম-উল-মুলক’ তাঁর ‘সিয়াসতনামা’ গ্রন্থে রাষ্ট্র পরিচালনার যে দর্শনের কথা বলেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, শাসকের অনুরাগে কেউ যেন বিশেষ সুবিধা না পায় এবং বিরাগে কেউ যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। শাসকের উচিত তাঁর মন্ত্রিপরিষদ ও পারিষদবর্গের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা। যদি মন্ত্রীরা দুর্নীতিপরায়ণ হন, তবে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয় এবং শাসক দিশাহারা হয়ে পড়েন। পরিশেষে, সেই শাসকেই সেরা যিনি জ্ঞানী ও বিদ্বানদের সাহচর্যে থাকেন, কিন্তু সেই বিদ্বানরাই অধম যারা কেবল শাসকের অনুগ্রহ ও সাহচর্য লাভের আশায় ঘোরেন। নতুন সরকারের সামনে এখন এই চিরায়ত সত্যগুলো ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।