লিখেছেনঃ শামীম আহমেদ
সময়টা এখন স্ক্রল আর সোয়াইপের। কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে আমাদের জীবনযাপনের ধরনে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।বর্তমানে নেটিজেনদের একবেলা না খেয়ে থাকলেও চলে যায়, কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া কয়েক ঘণ্টা কাটানো যেন শ্বাসরুদ্ধকর। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় কোটির বেশি সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। মানুষের এই মাত্রাতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’ এবং রিলস বা শর্টস দেখার নেশাকে পুঁজি করে ডিজিটাল দুনিয়ায় আর্বিভাব ঘটেছে নতুন এক শ্রেণির। যাদেরকে “ডিজিটাল পীর’-বলা যেতে পারে ।
ডিজিটালাইজেশনের বহু ইতিবাচক দিক রয়েছে - এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, এবং আমার মতে ইতিবাচক দিকই বেশি হয়ত। ঘরে বসেই আজ বিশ্বমানের শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে তৈরি হয়েছে কিছু অন্ধকার গহ্বর। এই গহ্বরেই বাস করছেন একদল তথাকথিত মোটিভেশনাল স্পিকার, ট্রেইনার ও মেন্টর। তাদের মূল কাজ হলো মানুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখানো, আর সেই স্বপ্নের মোড়কে নিজেদের পকেট ভারী করা।
এই ডিজিটাল পীরদের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেই একটি অদ্ভুত সমীকরণ চোখে পড়ে। যারা প্রতিনিয়ত ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ‘সফল ব্যবসা’ আর ‘কোটিপতি’ হওয়ার মন্ত্র বিলি করছেন, তাদের নিজেদের জীবনে হয়তো ব্যবসার কোনো ‘ডিএনএ’ বা বাস্তব সাকসেস স্টোরি নেই। ডেল কার্নেগীর মতো লেখকদের সেলফ-হেল্প বইয়ের কিছু গালভরা বুলি, ইংরেজি মোটিভেশনাল স্পিচের বাংলা তর্জমা আর চটকদার প্রেজেন্টেশন - এগুলোই তাদের ব্যবসার মূল পুঁজি বলা যায় । তারা মূলত ‘ইমপ্রেশন’ বিক্রি করেন। এমনভাবে তারা মানুষকে মোটিভেট করেন যে, সাধারণ মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে তাদের ভক্ত বা ‘মুরিদ’-এ পরিণত হয়।
বর্তমান এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে হতাশা আর একঘেয়েমি কাটাতে একটু মোটিভেশন বা অনুপ্রেরণার প্রয়োজন রয়েছে বৈকি। অনলাইনে এমন অনেক মোটিভেশনাল স্পিকার, মেন্টর বা ট্রেইনার আছেন, যাদের কথা বা কনটেন্ট সত্যিই চমৎকার এবং বাস্তবসম্মত। তারা মানুষকে ইতিবাচক ভাবতে শেখান, নতুন কিছু করার সাহস জোগান এবং ক্যারিয়ার বা ব্যবসার প্রাথমিক জড়তা কাটাতে সাহায্য করেন। তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করার এই চর্চাটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং সমাজের জন্য দরকারিও ।কিন্তু মুদ্রার ঠিক উল্টো পিঠেই তৈরি হয়েছে এক অন্ধকার গহ্বর। অনুপ্রেরণা জোগানোর এই কাজটি যখন কেবলই অর্থ উপার্জনের আগ্রাসী হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই ঘটে বিপত্তি। অনলাইনে আজকাল এমন এক শ্রেণির তথাকথিত মেন্টর বা ‘ডিজিটাল পীর’-এর আবির্ভাব ঘটেছে, যারা ভালো কথার মোড়কে মানুষের পকেট কাটার এক নিপুণ ফাঁদ তৈরি করেছেন।
প্রশ্ন হলো, এই ফাঁদে পা দিচ্ছে কারা? এই ডিজিটাল পীরদের একটি বিশাল টার্গেট অডিয়েন্স রয়েছে। এরা হলো সেই শ্রেণির মানুষ, যাদের পুঁথিগত বা প্রায়োগিক জ্ঞান হয়তো কিছুটা কম, কিন্তু কিছু জমানো টাকা আছে। বেকারত্বের হতাশা, ৯টা-৫টা চাকরির একঘেয়েমি এবং শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার অদম্য বাসনা এই মানুষগুলোকে খুব সহজেই শিকারে পরিণত করে। ইভ্যালি বা অন্যান্য এমএলএম (MLM) স্ক্যামগুলো ঠিক যেই সাইকোলজি ব্যবহার করে এদেশের মানুষের পকেট কেটেছিল, এই ডিজিটাল পীরেরা অনেকটা একই পন্থায় কাজ করছেন। তারা মানুষের ‘অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি’ বা অ্যাবনরমাল গ্রোথের লোভ দেখাচ্ছেন।
তাদের অনেকেই বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে ইভেন্টের আয়োজন করেন। স্টেজে উঠে আলোর ঝলকানি আর মিউজিকের তালে তালে এমন এক মায়াজাল তৈরি করেন, যা দেখে উপস্থিত দর্শক হিপনোটাইজড হয়ে যায়। সেখানে কিছু মানুষকে ‘সাকসেস স্টোরি’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়, দেওয়া হয় সার্টিফিকেট আর রিকগনিশন। এগুলো যখন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ ভাবে - "ও পারলে, আমি কেন পারবো না?" এই ইমোশনাল ইনভলভমেন্টের সুযোগ নিয়েই পীরেরা তাদের আসল চালটি চালেন। বিক্রি করা শুরু করেন হাজার নয় লাখ টাকার ‘কোর্স’।
নৈতিকতার জায়গা থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ওঠে এখানেই - ‘ভ্যালু ফর মানি’। একজন মানুষ যখন একটি ট্রেনিং বা কোর্সের জন্য লাখ লাখ টাকা দিচ্ছেন, তিনি আসলে কী পাচ্ছেন? হ্যাঁ, মোটিভেশন দেওয়া বা মানুষকে উৎসাহিত করা কোনো খারাপ কাজ নয়। কিন্তু সেই মোটিভেশনের দাম কি এত টাকা হতে পারে? যে পরিমাণ টাকা তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন, তার বিনিময়ে তারা যে কন্টেন্ট বা স্কিল শেখাচ্ছেন, তা কি আসলেই সেই মূল্যের সমতুল্য?
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই ডিজিটাল পীরেরা খুব সচেতনভাবেই জানেন যে তাদের অডিয়েন্স কারা। তারা এটাও খুব ভালোভাবে বোঝেন যে, ওই নির্দিষ্ট মানুষগুলোর ক্ষেত্রে তাদের এই গতানুগতিক মোটিভেশন আদৌ কোনো কাজে আসবে কি না। সবকিছু জেনে-বুঝেও যখন তারা এই মানুষগুলোর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে নেন, তখন নৈতিকতার বিচারে তাদের আর সৎ বলার উপায় থাকে না। আপনি জেনেশুনে এমন কিছু মানুষের কাছে বিক্রি করছেন যা তার কোনো কাজেই আসবে না - এটি স্পষ্টতই এক ধরনের মানসিক চতুরতা। মূলত তারা অত্যন্ত সজ্ঞানে এবং সুকৌশলেই এই ‘ডিজিটাল প্রতারণা’র জাল বোনেন।
আর এই প্রতারণার বড় একটি অংশ হলো এদের দায়বদ্ধতার অভাব। এমএলএম বা ইভ্যালির মতো সরাসরি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ হয়তো এদের বিরুদ্ধে আনা যায় না। কারণ, চতুর এই ব্যবসায়ীরা কখনো সরাসরি ‘গ্যারান্টি’ শব্দটা কাগজে-কলমে লেখেন না। তারা খুব কৌশলে বলেন, "আমি তো পথ দেখিয়েছি, আপনি পরিশ্রম করেননি তাই সফল হননি।" অর্থাৎ, ব্যর্থতার পুরো দায়ভার গিয়ে পড়ে ওই নিরীহ ক্রেতার ঘাড়ে। আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে তারা সহজেই বেরিয়ে যান, আর পর্দার আড়ালে নিঃস্ব হয় হাজারো তরুণ।
এই পরিস্থিতির জন্য কেবল ডিজিটাল পীরদের দোষ দিয়ে লাভ নেই; দায় আমাদেরও আছে। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে শর্টকাটে সফল হওয়ার এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক প্রবণতা রয়েছে। আমরা পরিশ্রম ছাড়াই কোটিপতি হতে চাই। আমরা হুট করেই কাউকে বিশ্বাস করে ফেলি, কাউকে মাথার তাজ বানিয়ে অন্ধ অনুসারী হয়ে যাই। লজিক বা যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমরা আবেগ দিয়ে ঢেকে রাখি। একটি কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে আমরা যাচাই করি না যে, এই মেন্টরের আসলে বাস্তব অভিজ্ঞতা কতটুকু। আমরা শুধু তার লাইক, কমেন্ট আর চাকচিক্য দেখে প্রভাবিত হই।
আমাদের এখন সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। অন্ধভক্তি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতাকে লজিক দিয়ে বিচার করতে হবে। ডিজিটাল দুনিয়ায় কেউ আপনাকে রাতারাতি জাদুদণ্ড দিয়ে কোটিপতি বানিয়ে দেবে না। প্রকৃত সফলতার জন্য প্রয়োজন সঠিক স্কিল, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক পরিশ্রম। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কোনো কিছু কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন - এর কি আদৌ কোনো ‘ভ্যালু ফর মানি’ আছে?
পরিশেষে বলতে হয়, মোটিভেশন মানুষের জীবনে দরকার আছে। কিন্তু সেই মোটিভেশন যখন ব্যবসার প্রধান ও একমাত্র হাতিয়ার হয়ে ওঠে, এবং তার বিনিময়ে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে টাকা হাতানো হয় - তখন তাকে আর যা-ই হোক, সততা বলা যায় না। এই ডিজিটাল প্রতারণার মায়াজাল ছিন্ন করতে হলে আমাদের নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনা জরুরি। শর্টকাট সফলতার মোহ ত্যাগ করে, অন্ধ মুরিদ না হয়ে, লজিক্যাল ও সচেতন মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার এখনই মোক্ষম সময়। নতুবা, এই ডিজিটাল পীরদের ব্যবসার গ্রাফ হয়তো দিন দিন বাড়তেই থাকবে, আর আমরা হারিয়ে যাবো এক সীমাহীন অন্ধকারের গোলকধাঁধায়।