২১ হাজার প্রার্থীর ভিড়ে একমাত্র বাংলাদেশি: বিশ্বখ্যাত পরমাণু গবেষণা সংস্থা সার্নে মাহিম ইসলামের বাজিমাত!

বিশ্বের সর্ববৃহৎ পরমাণু গবেষণা সংস্থা এবং ইন্টারনেটের ঐতিহাসিক জন্মভূমি সুইজারল্যান্ডের ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ (সংক্ষেপে ‘সার্ন’)-এ ইন্টার্নশিপ করে দেশের জন্য বিরল এক সম্মান বয়ে এনেছেন বাংলাদেশি তরুণ মাহিম ইসলাম[1]। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী সার্নের মর্যাদাপূর্ণ ‘সামার স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম’-এ অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন[1]। বিশ্বজুড়ে ৯০টিরও বেশি দেশ থেকে আবেদন করা ২১ হাজারেরও বেশি অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে যে ৩২২ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে লাল-সবুজের প্রতিনিধি হিসেবে মাহিমই ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি[1]। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সার্নের সদস্যরাষ্ট্র না হওয়া সত্ত্বেও মেধা ও নিজস্ব কাজের শক্তিতে এই অবিশ্বাস্য মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি[1]।

মাহিম ইসলামের এই রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক যাত্রার স্বপ্নবীজ বোনা হয়েছিল শৈশবেই[1]। স্কুলে সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে নিয়ে পড়ার সময় তিনি প্রথম জানতে পারেন পদার্থবিজ্ঞানের একটি কণা শ্রেণির নাম এই বাঙালি বিজ্ঞানীর নামে ‘বোসন’ রাখা হয়েছে[1]। পরবর্তীতে ২০১২ সালে সার্নে যুগান্তকারী ‘হিগস বোসন’ বা ‘গড পার্টিকেল’ আবিষ্কৃত হলে তাঁর কৌতূহল আরও তীব্র রূপ নেয়[1]। শুরু হয় ভূগর্ভের ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার সুরঙ্গ লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (এলএইচসি) নিয়ে পড়াশোনা[1]। তবে দূর মহাবিশ্বের রহস্য ও পদার্থের মৌলিক কণা নিয়ে গবেষণার এই মহাযজ্ঞের আঙিনায় নিজে কখনো পা রাখতে পারবেন, এমনটা শুরুতে ভাবতেও পারেননি তিনি[1]।

পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সিনিয়র শিক্ষার্থী জারিন আনজুম ও জেমস পিটার গোমেজের উৎসাহে সার্নের সামার স্টুডেন্ট প্রোগ্রামে আবেদনের সিদ্ধান্ত নেন মাহিম[1]। আবেদনের শর্ত হিসেবে প্রয়োজন ছিল সিভি, স্টেটমেন্ট অব পারপাস, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সুপারিশপত্র[1]। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ফলের দিক থেকে মাহিমের সিজিপিএ খুব বেশি উজ্জ্বল ছিল না, এমনকি কোনো অধ্যাপকের কাছ থেকেও তিনি সুপারিশপত্র জোগাড় করতে পারেননি[1]। শেষ পর্যন্ত একজন ল্যাব ইনস্ট্রাক্টরের দেওয়া সুপারিশপত্র এবং ক্লাসের বাইরে নিজের ভালোলাগা থেকে তৈরি করা কিছু ব্যক্তিগত টেকনিক্যাল প্রজেক্টের ওপর ভর করেই আবেদন জমা দেন তিনি[1]। এরপর গত ২৯ এপ্রিল মাগরিবের নামাজ শেষে ইমেইল ইনবক্স খুলে দেখতে পান চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের বার্তা[1]।

সার্নের সার্বিক অর্থায়নে বিমানভ্রমণ, থাকা-খাওয়া ও ভিসা প্রক্রিয়ার সহায়তা পেয়ে প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজে চড়ে জেনেভায় পাড়ি জমান মাহিম[1]। সেখানে তাঁর আবাসন ছিল ফ্রান্সের সাঁ-জেনি এলাকায়, আর কাজের ক্ষেত্র ছিল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত সার্নের সুবিশাল ক্যাম্পাসে[1]। প্রতিদিন সকালে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে অফিস করার এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মযজ্ঞ[1]। তিনি মূলত সার্নের আন্তর্জাতিক ‘অ্যালিস’ (আ লার্জ আয়ন কোলাইডার এক্সপেরিমেন্ট) প্রকল্পের কম্পিউটিং গ্রিডে কাজ করেন[1]। তাঁর অধীনে কাজ করা দুই সুপারভাইজার ছিলেন যথাক্রমে নরওয়ে ও রোমানিয়ার বিজ্ঞানী[1]।

এলএইচসিতে কণাগুলোর তীব্র সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া বিপুল পরিমাণ ডেটা পৃথিবীর কোনো একক কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করা অসম্ভব; হাজার হাজার কম্পিউটার গ্রিডের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়[1]। মাহিমের মূল দায়িত্ব ছিল অ্যালিসের সফটওয়্যারকে এমন কিছু নতুন প্রজন্মের প্রসেসরের উপযোগী করে কোড লেখা, যা তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ খরচ করবে এবং ভবিষ্যতে বিশালাকার কম্পিউটিং অবকাঠামোর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে[1]। নিজের কম্পিউটারের গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর লেখা কোডের ওপর যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের প্রবীণ গবেষকেরা নির্ভুলভাবে কাজ চালাচ্ছিলেন, একজন ছাত্র হিসেবে তা মাহিমের কাছে ছিল অত্যন্ত দায়বদ্ধতার ও গর্বের এক অনুভূতি[1]।

গবেষণাগারের গম্ভীর পরিবেশের বাইরেও সার্নের অভিজ্ঞতা ছিল মাহিমের জন্য শিক্ষণীয় ও বিস্ময়কর[1]। লাইব্রেরিতে কাচের বাক্সে রাখা নোবেল পদক দেখার পাশাপাশি প্রতিদিন যে সি++ ভাষায় তিনি কোড লিখতেন, সেই ভাষার জনক বিয়ারনে স্ট্রোস্ট্রুপের বক্তৃতা সরাসরি সামনে বসে শোনার স্বপ্নাতীত সুযোগ পান তিনি[1]। যাদেরকে বই, ইউটিউব কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখতেন, তাঁদের সান্নিধ্য পেয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে বিজ্ঞানচর্চায় যেকোনো জটিলতায় ‘আমি বুঝিনি’ বলে অকপটে প্রশ্ন করার সাহস থাকা কতটা জরুরি[1]। ছুটির দিনগুলোতে ইউরোপের সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও ফ্রান্সের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, লেক জেনেভায় সাঁতার এবং বিদেশি সহকর্মীদের কাছে ৫২-র ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ ও বাঙালি জাতির বিদ্রোহী ইতিহাসের গল্প শোনানোর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও করেন[1]।

নিজের এই জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা থেকে দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মাহিম ইসলামের বার্তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অনুপ্রেরণাদায়ী। তিনি বলেন, "ফলাফল খারাপ হয়েছে বলে নিজেকে আগে থেকেই বাদ দিয়ো না। যোগ্যতার সবটা শুধু ট্রান্সক্রিপ্টে লেখা থাকে না। যে বিষয়ে সত্যিই আগ্রহ, সেটা নিয়ে নিজে থেকে কিছু বানাও, শেখো, চেষ্টা করো। সুযোগ এলে আবেদন করো। হয়তো দরজাটা খুলবেই।"[1]

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।